রাজধানীজুড়ে কি নতুন করে নাশকতার ছক আঁকা হচ্ছে? নাকি উদ্দেশ্য শুধু জনমনে ভয় ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যস্ত রাখা? গত এক সপ্তাহে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে ধারাবাহিকভাবে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার, মতিঝিলে কার্যকর আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) শনাক্ত, আশুলিয়ায় প্রেসার কুকার আকৃতির বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের পর গতকাল শনিবার আবারও একই সময়ে রাজধানীর দুটি মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে সন্দেহজনক বস্তু পাওয়ার ঘটনায় এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
যদিও শনিবারের দুটি ঘটনাতেই শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি, তবুও তদন্তকারীরা বলছেন, ধারাবাহিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি ঘটনার পেছনের যোগসূত্র খুঁজে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে পুলিশের যানবাহনে সম্ভাব্য হামলার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর দেশব্যাপী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
একই দিনে দুই মেট্রো স্টেশনে আতঙ্ক : শনিবার সকালে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে দুটি পরিত্যক্ত বস্তু ঘিরে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। ব্যস্ত সময়ে যাত্রীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঢাকা মহানগর পুলিশের সদস্যরা এলাকা ঘিরে ফেলেন। পরে সিটিটিসির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে।
মিরপুর-১০ স্টেশনে পাওয়া একটি ব্যাগ এক্স-রে স্ক্যান করার পর ভেতরে ধাতব কৌটাসদৃশ বস্তু দেখা যায়। নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করে ফ্র্যাঞ্জিবল ডিসরাপ্টরের মাধ্যমে ব্যাগটি খোলা হলে দেখা যায়, ভেতরে রয়েছে একটি জর্দার কৌটা ও পান। অন্যদিকে ফার্মগেটে পাওয়া বস্তার ভেতরেও কোনো বিস্ফোরক বা ক্ষতিকর বস্তু পাওয়া যায়নি। দুই ঘটনাই শেষ পর্যন্ত স্বস্তির খবর দিলেও রাজধানীর মানুষের মনে প্রশ্ন রয়ে গেছে, একই দিনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল স্টেশনে এমন ঘটনা কি কেবলই কাকতালীয়?
যে আইইডি বদলে দিয়েছে নিরাপত্তা ভাবনা : সাম্প্রতিক উদ্বেগের মূল কারণ গত ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে উদ্ধার হওয়া কার্যকর আইইডি। জেনারেটর রুমের পাশে একটি ছাতার ভেতরে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বিস্ফোরকটি।
সেদিন ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে উল্টোরথের শোভাযাত্রা ওই এলাকা অতিক্রম করার কথা ছিল। আনসার সদস্যদের সতর্কতায় ছাতার ভেতরে মিটমিটে আলো দেখে সন্দেহ হয়। পরে সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ডিভাইসটি নিষ্ক্রিয় করে। তদন্তে জানা যায়, পাইপ বোমাটিতে সালফারজাতীয় বিস্ফোরক, বেয়ারিং বল, ধারালো লোহার টুকরা, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক সার্কিট সংযুক্ত ছিল। ছাতার বোতাম খুললেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারত। বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় স্প্লিন্টারের আঘাতে এক পথচারী আহত হন। এ ঘটনার পর থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
আশুলিয়ার প্রেসার কুকার রহস্য : মতিঝিলের ঘটনার মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় একটি চায়ের দোকানে রাখা ব্যাগ থেকে উদ্ধার হয় প্রেসার কুকার আকৃতির বোমাসদৃশ বস্তু। ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলে পুলিশ। পরে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেটি নিষ্ক্রিয় করে। কে বা কারা এটি রেখে গেছে, উদ্দেশ্য কী ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
আতঙ্ক ছড়ানোর নতুন কৌশল? নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক সময়ে শুধু বিস্ফোরণ ঘটানোই নয়, বিস্ফোরণের আতঙ্ক সৃষ্টি করাও একটি কৌশল। জনবহুল স্থানে পরিত্যক্ত ব্যাগ রেখে দেওয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো কিংবা সন্দেহজনক বস্তু রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা, এসবই মনস্তাত্ত্বিক নাশকতার অংশ হতে পারে। তাদের ভাষ্য, প্রতিটি পরিত্যক্ত ব্যাগ বোমা নয়, কিন্তু একটি কার্যকর আইইডি উদ্ধার হওয়ার পর কোনো ঘটনাকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
পুলিশের যানবাহন টার্গেট? এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদর দপ্তর মাঠপর্যায়ের সব ইউনিটকে বিশেষ সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পুলিশের জিপ, পিকআপ, বাসসহ সরকারি যানবাহনকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা হতে পারে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিউটির সময় কিংবা পার্কিং অবস্থায় কোনো যানবাহন নজরদারিহীন রাখা যাবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। থানা, পুলিশ লাইন্স, অফিস কম্পাউন্ডসহ সব স্থানে নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত টহল ও সন্দেহজনক বস্তু শনাক্তে বিশেষ নজর রাখতে বলা হয়েছে।
তদন্তে কী মিলছে? তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সব ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কোনো সংঘবদ্ধ চক্র এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, কিংবা এগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের মতে, এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি। তবে প্রতিটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত চলছে।
নাগরিকদের প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আহ্বান : আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনসচেতনতাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। কোনো পরিত্যক্ত ব্যাগ, বস্তা বা সন্দেহজনক বস্তু দেখলে তা স্পর্শ না করে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে হবে এবং দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে যাচাইবিহীন তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি না করারও আহ্বান জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন ভোরের ডাক’কে বলেন, মিরপুর ও ফার্মগেটে উদ্ধার হওয়া সন্দেহজনক বস্তু পরীক্ষা করে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশের যানবাহনের নিরাপত্তা জোরদারে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, সেটিও নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সতর্কতার সময়, আতঙ্কের নয় : সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে কিছু শেষ পর্যন্ত নিছক ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে প্রমাণিত হলেও মতিঝিলে কার্যকর আইইডি উদ্ধারের ঘটনা নিরাপত্তা ঝুঁকির বাস্তবতা সামনে এনে দিয়েছে। একই সময়ে পুলিশের যানবাহনে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় জারি হওয়া সতর্কতা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। তদন্তকারীরা বলছেন, সত্য উদ্ঘাটনে সময় লাগলেও একটি বিষয় স্পষ্ট, রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। জনসচেতনতা, আধুনিক নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়াই হতে পারে সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।