দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন আর শুধু বঙ্গোপসাগরীয় একটি উপকূলীয় রাষ্ট্র নয়, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, ভারত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে বিশ্বের তিন প্রভাবশালী শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত—বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে সক্রিয় উদ্যোগ নিচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ৩০ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত ও ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গরের ঢাকা সফরকে কেবল একটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, সফরটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে ওয়াশিংটনের উচ্চপর্যায়ের মূল্যায়নের অংশ। সফরে তিনি সরকারের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। একই সঙ্গে সম্ভাব্য মার্কিন ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের আগে বিনিয়োগ পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কেও ধারণা নেন।
এ ব্যাপারে দেশের অভিজ্ঞ কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মসয়ূদ মান্নান (এনডিসি) ভোরের ডাককে বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করার পর বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত আমেরিকা, চীন ও ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে অত্যন্ত আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহে সেটি প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূতের বাংলাদেশ সফর—বিষয়টিরই ইঙ্গিত দেয়।
তিনি বলেন, এটি বর্তমান সরকারের জন্য যেমন ইতিবাচক, তেমনি দেশের জন্যও ইতিবাচক ও মর্যাদাকর। তাছাড়া আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, আমাদের যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। যেহেতু সম্পর্ক জোরদারে এই দেশগুলোর আগ্রহ রয়েছে, এটিকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে ঘিরে প্রতিযোগিতা বাড়লেও ঢাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা। এই দৃষ্টিভঙ্গিই বর্তমানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তার মতে, বাংলাদেশ এখন এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে বড় শক্তিগুলো প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার ক্ষেত্রও খুঁজছে। তাই কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে ঢাকার সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
কূটনৈতিক বিশ্লেষক মাসরুর মাওলা ভোরের ডাককে বলেন, সার্জিও গরের সফর বৃহত্তর কৌশলগত বাস্তবতারই অংশ। এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পরিবর্তিত ভূরাজনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানকে নতুনভাবে মূল্যায়নের একটি প্রচেষ্টা।
তিনি বলেন, একই সময়ে চীনের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং ভারতের নিরাপত্তা ও সংযোগভিত্তিক সহযোগিতা—এই তিনটি ধারা মিলেই বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।
তিনি আরও বলেন, সার্জিও গরের এই সফরের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর আগে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন আলোচনা এগিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে ভারতও সংযোগ, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে সক্রিয়। ফলে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে তিন শক্তির কূটনৈতিক তৎপরতা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান।
জানা গেছে, চীন দীর্ঘদিন ধরে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, সেতু, টানেল ও শিল্প খাতে বড় বিনিয়োগ করছে। অন্যদিকে ভারত দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ, রেল, সড়ক, নৌ ও সীমান্ত সংযোগ জোরদারের পাশাপাশি নিরাপত্তা সহযোগিতাকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আবার বাণিজ্য, শ্রমমান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং উচ্চমূল্যের বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহী।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। ওই সফরকে বেইজিং-ঢাকা সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
এর অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ আমন্ত্রণ জানান, যা দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে উষ্ণ করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার কৌশলগত অবস্থান ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশ যদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে সমানভাবে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারে, তবে এই প্রতিযোগিতাই দেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগে পরিণত হতে পারে।
বর্তমান বাস্তবতায় স্পষ্ট যে বাংলাদেশ এখন আর কেবল আঞ্চলিক রাজনীতির অংশ নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত হিসাব-নিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সমান্তরাল কূটনৈতিক উদ্যোগ তারই প্রতিফলন। এই প্রতিযোগিতাকে অর্থনৈতিক সুযোগে রূপান্তর এবং জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে পারলেই বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার আরও বিস্তৃত হবে।