ঢাকার উত্তরায় র্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডে অবস্থিত টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেল, যা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত, পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর তিন বিচারপতি। তাদের সঙ্গে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এবং প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরা। পরিদর্শন শেষে টিএফআই সেলের কাঠামো, কথিত গোপন কক্ষ এবং নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে একাধিক নতুন তথ্য সামনে এসেছে।
চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, র্যাবের গোয়েন্দা শাখার নিয়ন্ত্রণাধীন এই স্থাপনাটি প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নির্মিত হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এটি বলপূর্বক গুম ও গোপন আটকের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার কারণে সেলটির কোডনেম ছিল ‘হাসপাতাল’।
পরিদর্শনে জানা যায়, ভবনটিতে মোট ২৯টি স্থায়ী সেল রয়েছে। এর মধ্যে নিচতলায় ১০টি, দ্বিতীয় তলায় আরও ১০টি সেল এবং দুটি বড় ‘ভিআইপি সেল’ রয়েছে। পাশাপাশি প্রবেশমুখের সিঁড়ির কাছে অত্যন্ত সংকীর্ণ সাতটি কক্ষ শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোকে ‘ডেথ সেল’ বা ‘যম সেল’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। আটক ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে গেলে করিডোরে অস্থায়ী পার্টিশন তৈরি করেও তাদের রাখা হতো বলে জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, ভবনের ভেতরে তিনটি সাউন্ডপ্রুফ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ ছিল, যেখানে বৈদ্যুতিক শক, ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, ঝুলিয়ে নির্যাতনের ব্যবস্থা এবং লোহার বেডসহ বিভিন্ন নির্যাতন সরঞ্জাম ব্যবহারের আলামত পাওয়া গেছে। এছাড়া ভয়ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দেয়ালে নির্যাতনের শিকার মানুষের বিভৎস ছবি টাঙিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও জানানো হয়।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তদন্তের শুরুতে স্থাপনাটির ভেতরে পরিবর্তন এনে প্রকৃত অবস্থা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে দেয়াল অপসারণ করে লুকিয়ে রাখা ২২টি কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। তার দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেয়াল তুলে ও কাঠামো পরিবর্তন করে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি পরে প্রমাণ গোপনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, টিএফআই সেলে গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে। মামলায় কয়েকজন ভুক্তভোগী সাক্ষ্য দিয়েছেন, যাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান অন্যতম। তদন্তে এখন পর্যন্ত গুম ও হত্যার শিকার ২৫০ জনের বেশি ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি বলেও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।