লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঋণ দেওয়ার ফাঁদ, ব্ল্যাকমেইল, দামি রেস্টুরেন্টে খাবারের ভুয়া ফরমাশ দেওয়াসহ নানাভাবে অনলাইনে প্রতারণা বেড়েছে। ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে বিভিন্ন লোভনীয় ও চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। অনলাইন প্রতারণা চক্র বেশি মুনাফা, কম খরচে বিদেশ যাত্রা কিংবা আকর্ষণীয় পণ্যের মিথ্যা লোভ দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
পুলিশ বলছে, সাইবার অপরাধের নতুন নতুন ধরন সামনে আসছে। বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণার ঘটনাই বেশি ঘটছে। ডিবির সাইবার সাপোর্ট ভিকটিম সেন্টারে প্রতিদিন সরাসরি এসে ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো ভুক্তভোগী অভিযোগ দিচ্ছেন। এছাড়া ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর ও দক্ষিণ) আলাদা করে বিভিন্ন থানা থেকে জিডি ও মামলা তদন্তের দায়িত্ব পাচ্ছে। সব মিলিয়ে দুই ইউনিটই ছয় শতাধিক জিডি, অভিযোগ ও মামলা তদন্ত করছে। আর এসবের বেশির ভাগ আর্থিক প্রতারণা, সম্পর্ক তৈরি করে ব্ল্যাকমেইল এবং দুর্নাম রটানো সংক্রান্ত।
জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের উর্বর ভূমিকে কাজে লাগিয়ে ডিভাইসের স্ক্রিনে লাল-নীল-বেগুনি রঙের পরতে পরতে প্রতারণা আর ঠকে যাওয়ার সব আয়োজন চলছে। অসাধু চক্র ভয়ংকর বহুরূপী ফাঁদ পেতে বসে আছে। লোভনীয় অফার, টাকা কামানোর চটকদার বিজ্ঞাপন আর বন্ধু বানানোর ডালি সাজিয়ে বসে রয়েছে। সেখানে পা দেওয়ার পর শেষরক্ষা হচ্ছে না। এখন সবার হাতেই ডিজিটাল ডিভাইস। প্রয়োজনীয় এই প্রযুক্তিপণ্য প্রয়োজনের আড়ালে কখনো কখনো জীবননাশ কিংবা সর্বস্বান্ত হওয়ার উপলক্ষ হয়ে উঠছে। এখন এমন ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের তথ্য বলছে, বর্তমানে প্রাপ্ত মোট অভিযোগের মধ্যে ৪৫.৫২ শতাংশই অনলাইন প্রতারণা। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অনলাইন হয়রানি, যার হার ২৯.১৪ শতাংশ। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের অভিযোগ ৬. ১৪ শতাংশ।
পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনলাইন প্রতারণার মধ্যে ফিশিং (ভুয়া ই-মেইল, এসএমএস বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাসওয়ার্ড, ব্যাংক তথ্য বা ওটিপি সংগ্রহ করা), ভুয়া অনলাইন কেনাবেচা, সোশ্যাল মিডিয়াবিষয়ক প্রতারণা, বিনিয়োগ প্রতারণা, লটারি বা পুরস্কারের প্রতারণা, ক্যাট ফিশিং ও রোমান্স স্ক্যাম অন্যতম। সাইবার ক্রাইম নিয়ে কাজ করেন আইটি এক্সপার্ট তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, অনলাইন প্রতারণা থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সতর্ক হতে হবে। লোভ সামলাতে হবে। অনলাইনে কারো সঙ্গে পরিচয় হলে সাবধান থাকতে হবে। আইটি এক্সপার্ট জোহা বলেন, ‘সাইবার অপরাধ এখন শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। তাই শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল নিরাপত্তা চর্চা এবং দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করাই এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’
সিআইডি সদর দপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে সিআইডি সাইবার পুলিশ সেন্টারে ২৫৮টি মামলা, ৬৫১টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং ৭২০টি অভিযোগ নিয়ে তদন্ত চলছে। এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম ইউনিট (উত্তর ও দক্ষিণ) প্রায় তিন হাজার ৭০০ সাইবার সংক্রান্ত জিডি তদন্ত করছে। এর বেশির ভাগই অনলাইনে প্রতারণাসংক্রান্ত। এছাড়া প্রায় ৫০০ সাইবার সংক্রান্ত মামলা তদন্ত করছে তারা। এ বিষয়ে সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আবু তালেব জানান, গত এক বছরে সাইবার অপরাধের ধরন ও কৌশলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। আগের তুলনায় প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক প্রতারণা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেন্দ্রিক অপরাধের সংখ্যা বেড়েছে। অপরাধীরা প্রতিনিয়ত নতুন প্রযুক্তি ও নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করায় তদন্ত সংস্থাগুলোকেও নিয়মিত নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হচ্ছে।
সাইবার হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশই নারী: ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের (এইচএসসি) এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক নিয়ন্ত্রণে নেয় একটি অপরাধী চক্র। মেয়েটির ছবি সম্পাদনা (এডিট) করে সেটা তার পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠিয়ে ১০ হাজার টাকা দাবি করে তারা। এই অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সম্প্রতি সূত্রাপুর থানায় মামলা করেন মেয়েটির মা। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। এ ঘটনায় বায়তুল ইসলাম ওরফে মুন্না নামের এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করে ডিবি। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বায়তুল বলেন, তিনি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিশানা করে তাদের ফেসবুক নিয়ন্ত্রণে নিতেন। পরে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবি করতেন। গ্রেপ্তারের সময় তার একটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়। মুঠোফোনটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করে অনেক নারীর ছবি, ভিডিও এবং বিভিন্ন পরিবারকে টাকা চেয়ে হুমকি দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে ডিবির তদন্ত কর্মকর্তা জুনায়েদ আলম সরকার জানান, সাইবারজগতে নারী ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে ফেসবুক আইডি হ্যাকিংয়ের ঘটনাই বেশি ঘটে। হ্যাকাররা বিভিন্ন লিংক পাঠিয়ে কৌশলে সেখানে ক্লিক করিয়ে পাসওয়ার্ড জেনে নেয়। এভাবে তারা আইডি হ্যাক করে ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরে ব্ল্যাকমেল করে টাকা আদায় করতে এগুলো ব্যবহার করে। এছাড়া প্রতারক চক্রের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরে তারা নারীদের ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করে। তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, দ্বি-ধাপ যাচাইকরণ (টু ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন) চালু করা এবং অপরিচিত লিংক বা অফারে সতর্ক থাকা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে সাইবার অপরাধ দমনে আরো কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব হবে।
সাইবার অপরাধ নিয়ে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক তৌহিদ ভূঁইয়া বলেন, দেশে যত সাইবার অপরাধ হয়, তার সব অভিযোগ পুলিশের কাছে আসেও না। বিচিত্র ধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। সামাজিক হেনস্তার ভয়ে অনেক ভুক্তভোগীই অভিযোগ দায়ের না করে চেপে যান। এতে সাইবার অপরাধীরা আরও অপরাধের সুযোগ পায়। সাইবার অপরাধের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা দিতে সরকারি উদ্যোগ দরকার বলে মনে করেন অধ্যাপক তৌহিদ ভূঁইয়া। এছাড়া স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বাধ্যতামূলকভাবে সাইবার সুরক্ষাবিষয়ক সচেতনতামূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।