১০ লাখের লোভে উধাও দিনমজুরের কিডনি

মো. মিজানুর রহমান, কালাই (জয়পুরহাট)

সারাদেশ

ঋণের কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে নিজের শরীরের অতি মূল্যবান অঙ্গ কিডনি বিক্রির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন গাইবান্ধার

2026-07-29T14:41:18+00:00
2026-07-29T14:49:40+00:00
  বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬,
২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
অঙ্গও গেল, অভাবও মিটল না
১০ লাখের লোভে উধাও দিনমজুরের কিডনি
মো. মিজানুর রহমান, কালাই (জয়পুরহাট)
বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ২:৪১ পিএম  আপডেট: ২৯.০৭.২০২৬ ২:৪৯ পিএম
প্রতীকী ছবি
ঋণের কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে নিজের শরীরের অতি মূল্যবান অঙ্গ কিডনি বিক্রির আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার দিনমজুর মন্টু মিয়া। 

অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক কিডনি পাচারকারী চক্র তাঁকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ভারত হয়ে নেপালে নিয়ে যায়। সেখানে একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। 

কিন্তু দেশে ফেরার পর প্রতিশ্রুত অর্থ তো দূরের কথা, মাত্র ৫০ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়েই আত্মগোপনে চলে যায় চক্রটি। 

একটি কিডনি হারিয়ে কর্মক্ষমতা হারানো মন্টু মিয়া এখন পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক ও মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিন বিচার না পেয়ে অবশেষে তিনি জয়পুরহাট আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।

যেভাবে পাতা হয়েছিল ফাঁদ : মামলার অভিযোগ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সংসারের অভাব মেটাতে স্থানীয় কয়েকটি এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছিলেন মন্টু মিয়া। দিনমজুরির আয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। পাওনাদারদের চাপ বাড়তে থাকলে ঠিক সেই সময় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে জয়পুরহাটের কালাই অঞ্চলে সক্রিয় একটি দালাল চক্র।

দালালরা তাঁকে জানায়, ঢাকার এক ধনী নারী কিডনি জটিলতায় ভুগছেন। একটি কিডনি দিলে বিনিময়ে নগদ ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। সেই টাকা দিয়ে সব ঋণ শোধ করে নতুন জীবন শুরু করা যাবে—এমন আশ্বাসেই রাজি হন অসহায় এই শ্রমিক।

অভিযোগ অনুযায়ী, চক্রটি দ্রুত তাঁর পাসপোর্ট তৈরি করে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ব্যবস্থা করে। গত জানুয়ারি মাসের শুরুতে অগ্রিম হিসেবে মাত্র ৫০ হাজার টাকা দিয়ে প্রথমে তাঁকে ভারতে এবং পরে নেপালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে একটি কিডনি অপসারণ করা হয়।

অঙ্গও গেল, অভাবও মিটল না : আদালত প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মন্টু মিয়া বলেন, ঋণের কিস্তির টাকা শোধ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। দালালেরা ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল। 

কিন্তু কিডনি কেটে নেওয়ার পর মাত্র ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়। বাকি টাকা চাইতে গেলে উল্টো প্রাণনাশের হুমকি দেয়। এখন আমি আগের মতো কাজ করতে পারি না। সংসার চালানোর মতো শক্তিও নেই। 

আমার শরীরের অঙ্গও গেল, অভাবও মিটল না। আমি এখন জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছি।

দেশে ফিরেই বদলে যায় দালালদের আচরণ : ভুক্তভোগীর অভিযোগ, অস্ত্রোপচারের পর অল্প কয়েকদিন চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর প্রতিশ্রুত বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাইলে দালালরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। 

স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস ও বিচার চাইলেও কোনো সমাধান হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি প্রকাশ করলে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

কর্মক্ষমতা হারিয়ে মানবেতর জীবন : একটি কিডনি হারানোর পর মন্টু মিয়া এখন নিয়মিত শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। সামান্য পরিশ্রম করলেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে পরিবারটি।

পরিবারের সদস্যরা বলেন, টাকাও পেলাম না, মানুষটার শরীরটাও শেষ করে দিল। এখন চিকিৎসা করানোর সামর্থ্যও নেই। আমরা শুধু দোষীদের বিচার চাই।

আদালতে মামলা, ছয়জনের নাম উল্লেখ : প্রতারণার শিকার হয়ে গত ১৩ জুন জয়পুরহাটের আমলি আদালত-৫-এ মন্টু মিয়া বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকে আসামি করে একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। 

আদালতের নির্দেশে পরদিন ১৪ জুন কালাই থানায় মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-এর আওতায় মামলাটি এফআইআর (মামলা নং-১৪) হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়।

মামলায় নামীয় আসামিরা হলেন—

১. বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা (খাঁপাড়া) এলাকার সাব্বির আহমেদ।

২. বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী।

৩. জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান।

৪. একই গ্রামের সাইদুর রহমান।

৫. কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের বহুতি (জয়পুর বহুতি) গ্রামের আব্দুস ছাত্তার।

৬. নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী।

এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৩ থেকে ৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা পরস্পরের যোগসাজশে ভুক্তভোগীকে ১০ লাখ টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে যান এবং প্রতারণার মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি অপসারণ করে প্রতিশ্রুত অর্থ আত্মসাৎ করেন। বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।

পুলিশের বক্তব্য : কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর অপরাধ। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশ কাজ করছে।

আইনজীবীর মতামত : জয়পুরহাট জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মো. উজ্জ্বল হোসেন বলেন, দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বিদেশে নিয়ে অঙ্গ অপসারণের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এটি সংঘবদ্ধ অপরাধের মধ্যে পড়ে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

উঠছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন : এই ঘটনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। একজন দরিদ্র দিনমজুরকে কীভাবে এত সহজে পাসপোর্ট করিয়ে বিদেশে নেওয়া হলো? ভারত হয়ে নেপালে চিকিৎসার নামে অঙ্গ অপসারণের পুরো প্রক্রিয়ায় কারা সহযোগিতা করেছে? 

সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, দালাল এবং অর্থ লেনদেনের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে কি? এই ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন, নাকি এর পেছনে আরও বড় আন্তর্জাতিক অঙ্গ পাচারকারী নেটওয়ার্ক কাজ করছে?

মন্টু মিয়ার অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটিত হলে শুধু একজন ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচারই নয়, দেশের দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে সক্রিয় সম্ভাব্য অঙ্গ পাচারকারী চক্রের ভয়াবহ চিত্রও সামনে আসতে পারে। 


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: