দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলকে কেন্দ্র করে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। কয়েক মাস আগেও যেখানে বিদ্যুৎ বিল ছিল স্বাভাবিক, সেখানে হঠাৎ করেই অনেক গ্রাহকের বিল দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতে হিমশিম খাওয়া এসব পরিবার এখন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে হিলি পল্লী বিদ্যুতের সাব-জোনাল অফিসে গিয়ে দেখা যায়, বিল পরিশোধের জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি। তবে শুধু বিল জমা দিতেই নয়, অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ জানাতেও অসংখ্য গ্রাহক সহকারী মহাব্যবস্থাপকের (এজিএম) কক্ষের সামনে ভিড় করেন। অনেকের হাতেই আগের ও বর্তমান মাসের বিল। একের পর এক গ্রাহকের প্রশ্ন, বিদ্যুৎ ব্যবহার না বাড়লেও বিল এত বাড়ল কীভাবে?
হাকিমপুর উপজেলার ১নং খট্টা ইউনিয়নের বাসিন্দা বিপ্লব হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পল্লী বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিলে আমরা দিশেহারা হয়ে গেছি। দুই মাস আগেও আমার বিদ্যুৎ বিল ছিল দুই হাজার থেকে দুই হাজার দুইশ টাকার মধ্যে। গত মাসে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার সাতশ টাকা, আর চলতি মাসে এসেছে সাত হাজার টাকারও বেশি। আমাদের ব্যবহারে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাহলে এই অতিরিক্ত বিল কোথা থেকে এলো? এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের পক্ষে বিদ্যুৎ ব্যবহার করাই কঠিন হয়ে যাবে।
হিলি বাজারের বাসনপট্টির ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান, পলাশ ও আপেলসহ একাধিক ব্যবসায়ী জানান, দোকানের বিদ্যুৎ ব্যবহারে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। অথচ কয়েক মাসের ব্যবধানে বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
তারা বলেন, আগেও যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছি, এখনও প্রায় একই পরিমাণ ব্যবহার করছি। কিন্তু বিল এসেছে দ্বিগুণেরও বেশি। এতে ব্যবসা পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা চাই বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা হোক।
বিল পরিশোধ করতে আসা গ্রাহক খোকন, আলী, মোহাব্বত, আজাহার আলীসহ আরও অনেকেই অভিযোগ করেন, বিদ্যুৎ বিভাগের বিল প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। তাদের ভাষায়, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রতি মাসে বিল বাড়ছে। সাধারণ মানুষের আয় তো বাড়ছে না, কিন্তু বিদ্যুৎ বিল বেড়েই চলেছে। এভাবে চললে সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়বে।
স্থানীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট কবির উদ্দিন বলেন, এই সাব-জোনাল অফিসে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে অনেক মিটারের রিডিং নেওয়া হয় না। ফলে একাধিক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যুক্ত হয়ে অতিরিক্ত বিল আসে। নিয়মিত মিটার রিডিং নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে। পাশাপাশি বিলিং ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, অনেক সময় মিটার রিডিং যথাসময়ে সংগ্রহ না করে অনুমাননির্ভর বিল তৈরি করা হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্বের বকেয়া ইউনিট একসঙ্গে যোগ হওয়ায় বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এসব কারণে প্রকৃত ব্যবহারকারীকে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ বহন করতে হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
এ বিষয়ে হিলি সাব-জোনাল অফিসের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী বলেন, বর্তমানে আগের তুলনায় লোডশেডিং অনেক কম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ বেড়েছে। এছাড়া বিদ্যুতের ইউনিট মূল্যও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব কারণে অনেক গ্রাহকের বিল বেশি আসছে। তবে কোনো গ্রাহকের মিটারের রিডিং বা বিলে অসঙ্গতির অভিযোগ থাকলে আমরা তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
তবে কর্তৃপক্ষের এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন অধিকাংশ গ্রাহক। তাদের দাবি, বিদ্যুতের ব্যবহার না বাড়লেও বিল অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে প্রকৃত কারণ উদঘাটনে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রতিটি মিটারের নিয়মিত রিডিং গ্রহণ, বিল প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
হিলিবাসীর অভিযোগ, বিদ্যুৎ মানুষের মৌলিক সেবার অন্যতম একটি খাত। সেই সেবার বিল যদি বাস্তব ব্যবহার ছাড়িয়ে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তাই দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী সঠিক বিল নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।