বর্ষায় ডুবে যাওয়া তেনাছিড়া বিল এখন ‘মিনি কক্সবাজার’

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা)

সারাদেশ

বর্ষা যেন নতুন রঙে সাজিয়ে তোলে বাংলার প্রকৃতিকে। আকাশভরা মেঘ, টলমলে জলরাশি আর সবুজের অপার বিস্তার—এসব মিলেই তৈরি হয় এক

2026-07-26T11:15:47+00:00
2026-07-26T11:15:47+00:00
  বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬,
২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
বর্ষায় ডুবে যাওয়া তেনাছিড়া বিল এখন ‘মিনি কক্সবাজার’
ছাদেকুল ইসলাম রুবেল, পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা)
রোববার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১১:১৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
বর্ষা যেন নতুন রঙে সাজিয়ে তোলে বাংলার প্রকৃতিকে। আকাশভরা মেঘ, টলমলে জলরাশি আর সবুজের অপার বিস্তার—এসব মিলেই তৈরি হয় এক অনিন্দ্য সুন্দর জলভূমির কাব্য। সেই কাব্যেরই এক জীবন্ত অধ্যায় গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী তেনাছিড়া বিল। চারদিকে অথৈ পানি, মাঝখান দিয়ে সাপের মতো আঁকাবাঁকা পাকা সড়ক, দুই পাশে সারি সারি গাছ, জলে ফুটে থাকা সাদা শাপলা আর গোলাপি পদ্ম—সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতি নিজেই এঁকেছে এক অপরূপ জলরঙের ছবি।

বর্ষার এই মোহনীয় রূপে স্থানীয়দের মুখে মুখে তেনাছিড়া বিলের নতুন নাম—‘মিনি কক্সবাজার’। প্রতিদিন বিকেল গড়াতেই এখানে ভিড় জমে প্রকৃতিপ্রেমী, ভ্রমণপিপাসু ও আলোকচিত্রপ্রেমীদের। বিশেষ করে শুক্রবার  জুমার নামাজের পর থেকে ছুটির দিনগুলোতে বিলপাড় মুখর হয়ে ওঠে দর্শনার্থীদের পদচারণায়।

উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ বিলগুলোর অন্যতম তেনাছিড়া বিল শুধু একটি জলাভূমিই নয়; এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একটি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। বছরের অধিকাংশ সময় কৃষিজমি হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্ষা এলেই বিলটি পরিণত হয় বিশাল জলরাশিতে। তখন এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নির্মিত সড়কের একটি অংশ বর্ষার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী নান্দনিক দৃশ্য। দূর থেকে মনে হয়, যেন বিশাল জলরাশির বুক চিরে এগিয়ে গেছে এক স্বপ্নের পথ। বিকেলের কোমল আলো, শীতল বাতাস, ঢেউয়ের মৃদু দোলা আর অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা মুহূর্তেই দর্শনার্থীদের মন কেড়ে নেয়।

এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে গাইবান্ধার পাশাপাশি বগুড়া, রংপুর, কুড়িগ্রাম, জামালপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসছেন। কেউ পরিবার নিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাচ্ছেন, কেউ ছোট নৌকায় বিল ঘুরে দেখছেন, আবার কেউ স্মৃতিকে ধরে রাখতে ব্যস্ত ছবি ও ভিডিও ধারণে। শিশুদের হাসি, পানির কলকল ধ্বনি আর পাখির কিচিরমিচিরে পুরো বিলজুড়ে সৃষ্টি হয় এক নির্মল, প্রশান্ত পরিবেশ।

সাঘাটা পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিখর মাহমুদ বলেন, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে এসেছি। দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সামর্থ্য সবার থাকে না। তাই আমাদের কাছে ঘরের পাশের তেনাছিড়া বিলই যেন কক্সবাজারের আনন্দ এনে দেয়।

বগুড়া থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা লেখক ও সাংবাদিক প্রতীক ওমর বলেন, তেনাছিড়া বিল শুধু একটি বিল নয়, এটি গ্রামবাংলার প্রকৃতির এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময়ের দৃশ্য সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

কলেজ শিক্ষক মাইদুল ইসলাম বলেন, এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব কম জায়গায় দেখা যায়। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে তেনাছিড়া বিল উত্তরাঞ্চলের অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতে পারে।

সাঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, চলতি মৌসুমে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে তেনাছিড়া বিলে পর্যাপ্ত পানি জমেছে। ফলে বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি ফুটে উঠেছে।

সাঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল কবির বলেন, পানি বৃদ্ধির কারণে বিলে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে এটিকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটনবান্ধব করা যায়, সে বিষয়ে আমরা কাজ করবো।

প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, তেনাছিড়া বিল শুধু একটি ভ্রমণস্থান নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের জলভূমিনির্ভর জীবন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এক অনন্য পরিচয়। যথাযথ পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ নৌভ্রমণ, বিশ্রামাগার, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হলে তেনাছিড়া বিল ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে।

বর্ষার জল, শাপলা-পদ্মের রঙ, সবুজের সমারোহ আর প্রকৃতির নীরব সুরে তেনাছিড়া বিল আজ যেন নতুন করে জানিয়ে দিচ্ছে—বাংলার সৌন্দর্য খুঁজতে সবসময় সমুদ্রের কাছে যেতে হয় না; কখনো কখনো একটি বিলও হয়ে ওঠে হৃদয়ের ‘মিনি কক্সবাজার’।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: