পাম্পে লম্বা লাইন, বন্ধ বসতবাড়ি-কারখানার চুলা

সোহাগ রাসিফ

জাতীয়

সারাদেশে আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে গ্যাস সংকট। একদিকে রাজধানীসহ দেশজুরে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদামত মিলছে না গ্যাস। যে পাম্পে গ্যাসের

2026-07-25T10:55:12+00:00
2026-07-25T12:41:48+00:00
  বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬,
২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
ফের বাড়ছে গ্যাস সংকট
পাম্পে লম্বা লাইন, বন্ধ বসতবাড়ি-কারখানার চুলা
সোহাগ রাসিফ
শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম  আপডেট: ২৫.০৭.২০২৬ ১২:৪১ পিএম
সংগৃহীত ছবি
সারাদেশে আবারও তীব্র হয়ে উঠেছে গ্যাস সংকট। একদিকে রাজধানীসহ দেশজুরে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদামত মিলছে না গ্যাস। যে পাম্পে গ্যাসের সন্ধান পাচ্ছে সেখানেই ভীড় করছে চালকরা, লম্বা হচ্ছে যানবানের সারি । 

অন্যদিকে রাজধানীর অর্ধেক এলাকায় জ¦লছে না বসতবাড়ির চুলা, কিছুকিছু এলাকার চুলা মিটমিটিয়ে জ¦লছে, যেখানে চাল ফুটতেই সময় লাগছে ঘন্টার পর ঘন্টা। একইসাথে গ্যাস সংকটে বন্ধ হচ্ছে ছোট-বড় শিল্প-কারখানায়, কমছে উৎপাদন। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধছে। গ্যাসের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর।

গ্যাস সংকটের মূল কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, মহেশখালীতে অবস্থিত মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলেরেট এনার্জি পরিচালিত একটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে গত মঙ্গলবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। 

এছাড়া নির্ধারিত একটি এলএনজি কার্গো সময়মতো দেশে না পৌঁছানোয় আরও ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে, যেখানে স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৬৬ কোটি ঘনফুট। 

অন্তহীন অপেক্ষা শেষে বিক্ষোভ: গ্যাস সংকটের সবচেয়ে করুণ চিত্র দেখা যাচ্ছে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। 

শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে, তেজগাও অঞ্চলের ফিলিং স্টেশন ‘অল ইন ওয়ান’, মগবাজার এলাকার চৌধুরীপাড়া রসিএনজি ফিলিং স্টেশন, ডেমরার আসমা আলী ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের লম্বা সারি। অনেকে ৫ঘন্টা লাইনে দাড়িয়েও পাননি কাঙ্খিত গ্যাস। 

রাজধানীর মালিবাগের একটি স্টেশনে রাত ৩টায় লাইনে দাঁড়িয়ে বেলা ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস পাননি চালক গোলাম হোসেন। নিকুঞ্জ এলাকার সিটি ওভারসিজ স্টেশনে সিএনজি ও প্রাইভেটকারের বিশাল লাইন কুর্মিটোলা হাসপাতাল ছাড়িয়ে গেছে। 

দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে চালকরা একপর্যায়ে কিছু সময় সড়ক অবরোধ করে বসেন। অনেক স্টেশনে ‘গ্যাস নাই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস না পেয়ে ফিরতে হচ্ছে চালকদের।

তাদের অভিযোগ, লাইনে গ্যাসের চাপ (পিএসআই) এতটাই কম যে সিলিন্ডারের অর্ধেকও পূর্ণ হচ্ছে না। সাধারণ সময়ে যেখানে ১১০০ টাকার গ্যাস নেওয়া যেত, এখন ৫০০ টাকার বেশি গ্যাস ঢুকছে না। এর ফলে চালকদের আয় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।

পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠায় বুধবার সকালে ময়মনসিংহের দিগারকান্দা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন সিএনজি চালকরা। একই দিনে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকাতেও বিমানবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন সিএনজি চালকরা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর একাধিক জায়গায় ঝটিকা বিক্ষোভ করে খেটে খাওয়া লেগুনা চালকরা।

ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ: গ্যাসের এই বড় সংকটের পেছনে শুধু ‘কারিগরি ত্রুটি’ মেনে নিতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। মগবাজারে ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়ানো অনেক চালক ও ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোরের ডাককে অভিযোগ করে বলেন, এটি আসলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর একটি পরিকল্পিত পাঁয়তারা। 

তাদের মতে, এর আগে তেলের সংকটের সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করে শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছিল। 

ভুক্তভোগীদের আশঙ্কা, কৃত্রিমভাবে এই সংকট জিইয়ে রেখে সাধারণ মানুষের সহ্যের সীমা পরীক্ষা করা হচ্ছে যাতে দাম বাড়ালে কেউ প্রতিবাদ করার শক্তি না পায়। 

সিএনজি চালক পারভেজ ক্ষোভের সাথে ভোরের ডাককে বলেন, খাওয়া-দাওয়া নেই, বিশ্রাম নেই, শুধু লাইনেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়; অথচ আসল ঘটনা কেউ বলছে না। 

উবারে প্রাইভেট কার চালক জসিম উদ্দিন বলেন, সরকার বলছে সংকট নেই, বাস্তবে তো সংকট। এই সংকটের শেষ কি তবে পকেট কাটার নতুন কোনো ঘোষণায়? 

যাত্রাবাড়ি থেকে স্টাফ কোয়ার্টারগামী লেগুনা চালক জাহিদুল ভোরের ডাককে বলেন, আমরা গ্যাস পাচ্ছিনা। যা গ্যাস আছে তা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছি। তবে ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা বলে ডাকছি, যারা আগ্রহী তাদের গাড়িতে তুলছি।

মিটমিটে চুলা ও গৃহিণীদের আর্তনাদ: বাসাবাড়ির চিত্র আরও ভয়াবহ। যাত্রাবাড়ি, ডেমরা, ওয়ারীর অধিকাংশ এলাকার বসতবাড়িতে ১ মাস ধরে গ্যাসের ছিটেফোটাও নেই। 

রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মালিবাগ, লালবাগ ও উত্তরার মতো এলাকায় চুলা জ্বলছে নামমাত্র। অনেক জায়গায় চুলা মিটমিট করে জ্বললেও তাতে ভাত ফুটতে সময় লাগছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। 

অনেকে বাধ্য হয়ে এলপিজি, ইন্ডাকশন বা ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন, যা সাধারণ মানুষের পারিবারিক ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাভারে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের দাবিতে বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা তিতাসের আঞ্চলিক অফিস ঘেরাও করেছেন।

মধ্যবাড্ডার এক বাসিন্দা সামিয়া ইসলাম জানান, শুধু ভাত রান্না করতেই তার এক ঘণ্টা সময় লেগেছে, অন্য কিছু আর রাঁধতে পারেননি; বাধ্য হয়ে বাড়ির সবাই গরম ভাত পান্তা বানিয়ে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে খেয়েছেন। 

ডেমরার এক বাড়িওয়ালা বলেন, ১ মাস ধরে এই এলাকায় গ্যাস নেই। বাভাটিয়ারা বাসাভাড়া কমিয়ে দিচ্ছে, সরকার তো ঠিকই প্রতি মাসে গ্যাস বিল নিয়ে নিচ্ছে। আমরা এক উভয়মুখী সংকটে পড়ছি।

শিল্পোৎপাদনে ধস ও লোডশেডিংয়ের শঙ্কা: গ্যাস সংকটের কারণে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চল সাভার, গাজীপুর ও আশুলিয়ায় শিল্পোৎপাদন প্রায় অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। 

বিশেষ করে সিরামিক, ইস্পাত ও টেক্সটাইল খাতের শত শত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সাভার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ যেখানে ৪০-৫০ পিএসআই থাকার কথা, সেখানে তা ১২ পিএসআই-তে নেমে এসেছে। 

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) সতর্ক করেছেন যে, পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করলে চলমান শিল্পগুলো বন্ধ হয়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হবে। ওদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ায় দেশে লোডশেডিংয়ের মাত্রাও বেড়েছে।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহেশখালীর সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই তীব্র সংকট কাটার সম্ভাবনা কম। জরাজীর্ণ পাইপলাইন এবং বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়াও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। 

জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল মেরামতের কাজ চলছে এবং আরও এক থেকে দুই দিনের মধ্যে সরবরাহ আংশিক স্বাভাবিক হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য নতুন কূপ খনন এবং এলএনজি আমদানির বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 


  বিষয়:   গ্যাস সংকট  রাজধানী  পাম্পে গ্যাস 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: