তরুণদের রক্তলেখায় অবিশ্বাস্য বিজয়

আবদুর রহমান মল্লিক

জাতীয়

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম সোনালি অধ্যায়। যে জুলাইয়ের মূলে ছিল অধিকার সচেতন প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা। তাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকায় অত্যন্ত

2026-08-05T13:02:17+00:00
2026-08-05T13:02:17+00:00
  বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬,
২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ
তরুণদের রক্তলেখায় অবিশ্বাস্য বিজয়
আবদুর রহমান মল্লিক
বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১:০২ পিএম 
ফাইল ছবি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম সোনালি অধ্যায়। যে জুলাইয়ের মূলে ছিল অধিকার সচেতন প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা। তাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকায় অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। ছত্রিশ জুলাই কিংবা পাঁচ আগস্ট ঢাকার রাজপথে সেদিন এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতার বিপুল স্রোত গণভবনের দিকে ধাবিত হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলবল নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধের ইস্পাতকঠিন দেয়াল তৈরি করেছিল তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা। শিক্ষার্থীরা যে রক্তলেখায় দেয়ালে দেয়ালে জাতীয় আকাক্সক্ষার গ্রাফিতি এঁকেছিল তার বাস্তবায়ন পথে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।  

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ৩৬ জুলাই বলতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে নির্দেশ করে। অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষিত সৃষ্ট গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের দীর্ঘকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই দিন পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসে ‘৩৬ জুলাই’ একটি প্রতীকী দিন হিসেবে বিবেচিত হয়। এই তারিখটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়, যা দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

২০২৪ সালের ৫ জুন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে একটি রায় দেন। এই রায়ের প্রতিবাদে দেশব্যাপী শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজ কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনে নামে। ১৬ জুলাই এই আন্দোলন সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাকে ‘জুলাই গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এরপর ২১ জুলাই, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে কোটা সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি।

আন্দোলনকারীরা তখন জানান, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত জুলাই মাস চলতেই থাকবেÑ ফলে তারা ১ আগস্টকে ৩২ জুলাই, ২ আগস্টকে ৩৩ জুলাই ইত্যাদি হিসেবে উল্লেখ করতে থাকেন। এই ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্টকে ‘৩৫ জুলাই’ এবং ৫ আগস্টকে ‘৩৬ জুলাই’ বলা হয়।

২০২৪ সালের জুলাই মাস ৩১ দিনের হলেও ক্যালেন্ডারের পাতায় তাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্দোলনের উত্তাপে মাসটি হয়ে উঠেছিল ৩৬ দিনের দীর্ঘ এক সংগ্রামের নাম। এই ‘৩৬ জুলাই’ শুধু একটি প্রতীকী তারিখ নয়Ñ এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য নতুন অধ্যায়। রক্তাক্ত সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ‘৩৬ জুলাই’ হয়ে উঠেছে স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পালাবদলের মুহূর্ত।

জুলাই-আগস্টের পালাবদলের শুরুটা হয়েছিল ৫ জুন, যখন হাইকোর্ট এক রায়ে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়। রায়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তারা একে ‘বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য’ হিসেবে উল্লেখ করে সোচ্চার হতে থাকেন। ওইদিন সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রতিবাদ মিছিল বের হয়, যা পরদিন আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে। প্রতিবাদের এই স্ফুলিঙ্গ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই থেমে থাকেনি। ক্রমেই তা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

এর মধ্যেই ঈদের ছুটির কারণে আন্দোলনে সাময়িক বিরতি আসে। তবে ১ জুলাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দিন থেকেই আন্দোলন ফিরে আসে দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে। শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন, যা দ্রুতই জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। নেতৃত্বহীন কাঠামো এবং সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই আন্দোলন হয়ে ওঠে নতুন ধারার গণসংগ্রাম।

৪ জুলাই, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। পরদিন থেকে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও অবস্থান কর্মসূচি। ৬ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঘোষণা আসে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির, যা ৭ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। এই কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে সড়ক ও রেলপথে অবরোধ তৈরি হয়, অচল হয়ে পড়ে জনজীবন।

১০ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেন। কিন্তু তাতেও আন্দোলন স্তিমিত হয়নি, বরং শুরু হয় সহিংসতা, যা পরিস্থিতিকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। ১৪ জুলাই, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে ঘিরে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। তিনি গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতি-পুতিরা কেউ মেধাবী না, যত রাজাকারের বাচ্চারা মেধাবী?’ এই বক্তব্য শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন করে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দেয়।

১৫ জুলাই ঢাবিতে ছাত্রলীগের হামলায় বহু শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর ঢামেকে আহতদের ওপর আবারও হামলা হয়। একই রাতে জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রলীগের আরেকটি হামলা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে ১৬ জুলাই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। রংপুরে সংঘর্ষে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তাকে গুলি করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর পরপরই জনতার ক্ষোভ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। ওই রাতেই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার, কিন্তু তাতে আন্দোলন থামেনি। বরং শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বের করে দেন, ঘোষণা করেন ‘রাজনীতিমুক্ত’ ক্যাম্পাস।

১৭ ও ১৮ জুলাই আন্দোলনে যুক্ত হন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। ঢাকা শহর তখন রূপ নেয় এক যুদ্ধক্ষেত্রে। সেদিন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে আন্দোলনের বিস্ফোরণ ঘটে, যার ফলে অন্তত ২৯ জন নিহত হন। সরকারপ্রধান প্রস্তাব দেন ২০ শতাংশ কোটা রাখার, কিন্তু আন্দোলনকারীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। রাতেই বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট সংযোগ।

১৯ জুলাই ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। হাসপাতালগুলোতে লাশের স্তূপ জমতে থাকে, শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। মেট্রোরেল স্টেশন, এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা, নরসিংদীর জেলখানা-সবখানেই সহিংসতা ও প্রতিরোধের চিত্র দেখা যায়। শেষমেশ জারি হয় কারফিউ, সেনাবাহিনী নামে রাস্তায়।

কিন্তু এত কিছুর পরও আন্দোলন থেমে থাকেনি, বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দিয়ে এটিকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে যায়। প্রতিবাদের এই ঢেউ থেমে থাকেনি ৩১ জুলাইয়ে। প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে তা এগিয়ে গেছে আরও একদিন। শহীদ, প্রতিবাদ, প্রতিশোধÑ সবকিছু মিলিয়ে এক মাস পরিণত হয় এক ঐতিহাসিক ৩৬ দিনে। কারণ জনগণ জানিয়ে দেয়-জুলাই তখনও শেষ হয়নি, যতক্ষণ না বিজয় আসে।

অবশেষে ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের সমাবেশে ঘোষণা আসে-সরকার পতনের এক দফা। ৪ আগস্ট ঘোষিত হয় ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি, যা একদিন এগিয়ে এনে নির্ধারণ করা হয় ৫ আগস্টে এবং সেই দিন-৫ আগস্ট; যা ইতিহাসে লেখা হয় ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে, ছিল দীর্ঘতম প্রতিবাদের বিজয় দিন। লাখো মানুষ ঢাকায় সমবেত হয়, পথে নামে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে। সেদিন দুপুরের আগেই শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। শেষ হয় একটি অধ্যায়ের, সূচনা হয় নতুন একটি সময়েরÑ তারুণ্যের, সাহসের, সমতার ও পরিবর্তনের সময়।

এই আন্দোলন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটি একটি প্রজন্মের জাগরণ। যে প্রজন্ম দীর্ঘদিন রাজনীতি ঘৃণা করে বেড়ে উঠেছিল, তারা বুঝে যায় রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে বাঁচা যায় না, বরং রাজনীতিকে বদলে দিয়েই বাঁচতে হয়। এই উপলব্ধি থেকেই তারা হয়ে ওঠে বিপ্লবী, আর সেই বিপ্লবের নাম ৩৬ দিনের এক জুলাই।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের মাঝে নতুন আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করেছে। পুরোনো ধ্যান-ধারণা দিয়ে আর দেশ পরিচালনা সম্ভব নয়। জনগণের অধিকার হরণ করে তাদের দাবিয়ে রাখাও সম্ভব নয়। জনগণের মাঝে প্রতিবাদী চেতনা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে অন্যায় অন্যায্যতা সেখানেই প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তোলার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বর্তমান সরকার জনপ্রত্যাশা বিবেচনা করে সরকার পরিচালনা করবে সেটাই প্রতাশা করে তরুণ সমাজ। দেশ পরিচালনায় তরুণ নেতৃত্ব এগিয়ে এলে আধুনিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে বলে মনে করে অভিজ্ঞমহল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সে পরিবর্তনের পথ ধরেই এগিয়ে চলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: