সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে একের পর এক নৈতিক স্খলনের অভিযোগ আসছে। ফলে এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নৈতিক স্খলনের দায়ে ইতোমধ্যে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে দলটি।
গত কয়েকদিন ধরে তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যেমে আলোড়ন সৃষ্টি হওয়ায় বহিষ্কার করার পাশাপাশি এখন এমপি পদ বাতিলের জন্য জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে দলটি।
এ বিষয়ে দলটির দায়িত্বশীলরা বলছেন, অনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত দলের যত বড়ই নেতা হোক না কেন তাকে সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। কারণ জামায়াত কখনো এ ধরনের নেতা-কর্মীদের আশ্রয় দেয় না। যার পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের মনোনয়নে দ্বিতীয়বারের মতো সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন গাজী নজরুল ইসলাম। তিনি সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সাবেক আমির ঠিলেন। বহিষ্কারের আগ পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সম্প্রতি গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২নং ধারা অনুযায়ী জামায়াত থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর আগে গত সোমবার রাতে এক তরুণীর সাথে গাজী নজরুল ইসলামের একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনায় সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ভাইরাল ভিডিওতে থাকা তরুণী গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী। সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে।
এমপি আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনি তার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এ বিয়ে হয়েছে। পরে গাজী নজরুল ইসলামও নিজের ফেসবুক পোস্টে একই দাবি করেন। এরপরপরই আরেক তরুণীর সাথে গাজী নজরুল ইসলামের আরেকটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত গাজী নজরুল ইসলাম বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এসব ঘটনায় বিব্রত অবস্থায় পড়েছে সংদসের বিরোধী দল জামায়াত। ফলে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে দলটি। তাকে এখন কীভাবে সংসদ সদদ্যের পদ থেকে সরানো যায় সে বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কর্তৃক স্পিকার এবং নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখন স্পিকার ও ইসির সিদ্ধান্তের অপক্ষোয় রয়েছে দলটি।
দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নৈতিক স্খলনের দায়ে বিগত সময়ে কোনো দলের সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে কি না আমাদের জানা নেই। তবে জামায়াতে এ ধরনের লোকদের জায়গা নেই। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে সংসদ গাজী নজরুল ইসলামকে দল বহিষ্কার করা হয়েছে।
ভবিষ্যতের যদি এ ধরনের কর্মকান্ডের সাথে কেউ জড়িয়ে পড়ে তার বিরুদ্ধেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না সে বিষয়ে স্পিকার ও ইসির সিদ্ধান্ত নেবে।
এদিকে, ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরালের প্রেক্ষাপটে নৈতিক স্খলনের দায়ে এমপি গাজী নজরুলকে জামায়াত বহিষ্কারের পরই তার সদস্য পদ থাকবে কি না প্রশ্ন উঠেছে। দল থেকে পদত্যাগ, ফ্লোর ক্রসের কারণে অতীতে এমপি পদ বাতিল হলেও, বহিষ্কারের ক্ষেত্রে পদ বাতিলের নজির নেই। দল কোনো এমপিকে বহিষ্কার করলে কী হবে তা সংবিধানেও বলা নেই।
৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো এমপি দল থেকে পদত্যাগ করলে বা বিরুদ্ধে ভোট দিলে এমপি পদ বাতিল হবে।
৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো এমপির নৈতিক স্খলনের কারণে দুই বছরের বেশি সময়ের জন্য কারাদন্ড হলে এমপি পদ বাতিল হবে। সাজার মেয়াদ শেষে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত এমপি হতে পারবেন না।
তাছাড়া, সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো এমপির আসন শূন্য হবে কি না, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
সংসদ সদস্য আইন-১৯৮১ এর ৩ ধারা অনুযায়ী, বিরোধ সৃষ্টির ৩০ দিনের মধ্যে স্পিকার বিরোধের বিবরণ প্রস্তুত করে শুনানির জন্য নির্বাচন কমিশনকে পাঠাবেন। তবে এ বিধানগুলো ৭০ অনুচ্ছেদ-সংক্রান্ত।
তবে গণপ্রতিনিধি আদেশ-১৯৭২ এর ১২(খ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এমপি নির্বাচিত হতে বা পদে থাকতে পারবেন না, যদি তিনি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত না হন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী না হন।
অপরদিকে ২০০৮ সালে আইনে যুক্ত করা বিধানের কারণে গাজী নজরুল পদ হারাবেন বলে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন।
আইনজীবী এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার বলেন, দল বহিষ্কার করলে এমপি পদে থাকার সুযোগ নেই। কারণ আইন অনুযায়ী এমপি দুই রকম, দলীয় ও স্বতন্ত্র। দল বহিষ্কার করলে সেই এমপি স্বতন্ত্র হয়ে যান না। ফলে দলে না থাকলে এমপি পদ থাকবে না। রিয়াজুল কবীর জানান, গাজী নজরুলের বিষয়ে এখন স্পিকার ও নির্বাচন কমিশন ঠিক করবে। এর আগেই আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের রায় বিপক্ষে গেলেও, তিনি আদালতে যেতে পারবেন। ফলে নিজে থেকে পদত্যাগ না করলে গাজী নজরুলের পদ বাতিল হলেও সময় লাগতে পারে।