নদীভাঙনে বিলীন বসতভিটা, বর্ষায় কেড়ে নিচ্ছে স্বপ্ন

‎বগুড়া জেলা সংবাদদাতা

সারাদেশ

বসবাসে মুখর ছিল বাঙালি নদী তীরের জনপদ। কৃষিকাজ, সংসারের ব্যস্ততা আর পারিবারিক বন্ধনে প্রাণবন্ত ছিল পুরো এলাকা। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার

2026-07-22T13:53:56+00:00
2026-07-22T13:55:40+00:00
  বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬,
৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
নদীভাঙনে বিলীন বসতভিটা, বর্ষায় কেড়ে নিচ্ছে স্বপ্ন
‎বগুড়া জেলা সংবাদদাতা
বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ১:৫৩ পিএম  আপডেট: ২২.০৭.২০২৬ ১:৫৫ পিএম
সংগৃহীত ছবি
বসবাসে মুখর ছিল বাঙালি নদী তীরের জনপদ। কৃষিকাজ, সংসারের ব্যস্ততা আর পারিবারিক বন্ধনে প্রাণবন্ত ছিল পুরো এলাকা। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চকখানপুরে নদী কিনারায় থাকা প্রতিটি পরিবারের দিন-রাত কাটছে উৎকণ্ঠায়। বর্ষার প্রতিটি রাত যেন একেকটি দুঃস্বপ্ন। 

গত কয়েক বছরের নদীভাঙনে ক্রমাগত বিলীন হয়েছে আবাদি জমি। নষ্ট হয়েছে ফসল, হারিয়ে গেছে অসংখ্য বসতভিটা। নদীতে বালু লুটের কারণে ভাঙন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। চকখানপুর নদীতীরে একসময় ১৩০ পরিবার বসবাস করলেও ভাঙনে অবশিষ্ট রয়েছে ৬০ পরিবার। কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এবারের বর্ষাতেও শঙ্কা বাড়াচ্ছে। 

স্থানীয়রা জানান, অনেক পরিবার চোখের সামনে পৈত্রিক ভিটা নদীতে তলিয়ে যেতে দেখেও কিছুই করতে পারেনি। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে বাধ্য হয়েছে অন্যত্রে আশ্রয় নিতে। আবার কেউ কেউ সবকিছু হারানোর আগেই সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। ভাঙতে বসেছে গ্রামের ছোট মন্দির। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বছরের পর বছর ধরে চলা নির্মম বাস্তবতায় চকখানপুর গ্রামের হাওলাদারপাড়ায় এখন অবশিষ্ট রয়েছে প্রায় ৬০ পরিবার। সেখানকার শতাধিক মানুষের এতদিন একমাত্র ভরসা ছিল, সরকারি উদ্যোগে হয়তো স্থায়ী নদীশাসন বা ভাঙনরোধী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই আশাতেই নিজেদের ভিটা আঁকড়ে ছিলেন। চলতি বছরেও সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটেনি। 

গতকাল বুধবার নদী তীরে নিশ্চুপ বসে ছিলেন ‎বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ৮০ বছর বয়সী বৃদ্ধা প্রভাতী রানী। তার কপালের গভীর ভাঁজে জমে থাকা আট দশকের জীবন সংগ্রামের গল্পটা থমকে গেছে। চোখের সামনে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে সারাজীবনের সঞ্চয়, স্বামীর রেখে যাওয়া শেষ সম্বল আর স্মৃতির ঠিকানা। কাঁপা কণ্ঠে কথা বলতে বলতে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন, ভিজে উঠছিল চোখ। তার বাড়ির অর্ধেকেরও বেশি অংশ ইতোমধ্যে বাঙালি নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট সামান্য ভিটাটুকুও এখন ভাঙনের মুখে। তার শেষ আশ্রয়টুকু হারানোর শঙ্কা। 

নদীর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বৃদ্ধা বলছিলেন, এই বয়সে আর কোথায় যাব বাবা? স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটাতেই সারাজীবন কাটিয়েছি। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে এই উঠোনেই সংসার গড়েছিলাম। এখন যদি এটুকুও নদী নিয়ে যায়, তাহলে শেষ বয়সে রাস্তায় দাঁড়ানো ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। ভগবান জানেন, আমাদের কপালে কী আছে। প্রভাতী রানীর মতো চকখানপুর হাওলাদারপাড়ার শতাধিক মানুষ নদীভাঙন শঙ্কায় আছেন। 
‎স্থানীয়রা জানিয়েছেন, চলতি বছরেই বাঙালি নদীর তীব্র ভাঙনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন জায়গায় ভাঙন ছড়িয়ে পড়ছে। সকালে ঘুম ভেঙে নিজের বাড়িটি অক্ষত অবস্থায় দেখতে পাবেন কি না, সেই নিশ্চয়তাও নেই। 
ভাঙন কবলিত এলাকার বাসিন্দা মংলা চন্দ্র হাওলদার বলেন, চোখের সামনে নদী সব গিলে খাচ্ছে। সারাজীবনের কষ্টে গড়া ঘর এখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে। দিন-রাত শুধু একটাই ভয়, কখন ঘুম থেকে উঠে দেখব, ঘরটা আর নেই। আমরা গরিব মানুষ, ভিটেমাটি হারালে মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই থাকবে না। ‎

উজ্জ্বল সরকার নামের যুবক জানান, নদী থেকে যেভাবে বালু তোলা হয়েছে, তার জন্যই এ বছর ভাঙন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। আমরা চিৎকার করলেও কেউ শুনে না। একদিকে নদী ঘর কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে সংসার চালানোর চিন্তা। গরিবের কান্নার কোনো দাম নেই। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা ‎সবরী রানীর চোখে ছিল অজানা ভবিষ্যতের ভয়। 

তিনি বলেন, পাশের বাড়িগুলো একে একে নদীতে চলে যেতে দেখেছি। এখন নিজের বাড়ির পালা। প্রতিদিন বুক ধড়ফড় করে। এই বুঝি আমাদের ঘরটাও নদীতে মিশে যাবে। সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, সেই উত্তর আমাদের জানা নেই। নদীপাড়ের মানুষের একটাই আকুতি, আর যেন একটি পরিবারও ভিটেমাটি হারিয়ে পথে না বসে। বর্ষার আরও একটি ঢেউ আসার আগেই কার্যকর নদীশাসন ও ভাঙনরোধ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন।

শেরপুর উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা শিগগিরই পরিদর্শন করা হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজন অনুযায়ী জিও ব্যাগ বা অন্যান্য সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। 
‎পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির জানান, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থায়ী সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আসন্ন বাজেটে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া মাত্রই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


  বিষয়:   বগুড়া  নদী  কৃষিকাজ  সংসার 


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: