সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা, অবিরাম ভারী বর্ষণ এবং পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের ৬৭টি নদী, খাল ও ছড়ার ৩৭১টি স্থানে মারাত্মক ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর ফলে প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ও রক্ষা বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
এই ব্যাপক ভাঙনের কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, পটিয়া, আনোয়ারা ও রাউজানসহ অন্তত সাতটি উপজেলার শতাধিক জনপদ চরম প্লাবন ও ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে।
পাউবো চট্টগ্রাম সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম জেলা এবং খাগড়াছড়ির কিছু অংশ মিলিয়ে ২৬৯টি পয়েন্টে নদী ও খালের বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে ২২ কিলোমিটার বাঁধ এবং ২৫টি স্লুইসগেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে, রাঙামাটি জেলার অধীনে থাকা ১০২টি স্থানে ভাঙন ধরা পড়েছে; যেখানে সাড়ে ৮ কিলোমিটার বাঁধ মেরামতে আরও প্রায় ৪২ কোটি টাকার প্রয়োজন।
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। চরম এই দুর্যোগে দুর্গতদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মাঠে নামে। বর্তমানে বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও ক্ষতিগ্রস্ত জনপদগুলোতে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট এবং ত্রাণ ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এছাড়া বন্যাকবলিত এসব অঞ্চলের প্রায় ৫৫০টি গ্রামীণ সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিন থেকে চার দশক আগে নির্মিত প্রাচীন স্লুইসগেটগুলো কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলায় এবং অনেক এলাকায় মাছ ও লবণ চাষিরা গেটগুলো নিজেদের মতো করে বন্ধ রাখায় বন্যার পানি নামতে মারাত্মক বিলম্ব হয়। পানি নিষ্কাশনের পথ রুদ্ধ থাকায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, নদী ও খালের ভাঙনকবলিত প্রধান এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ফটিকছড়ি: হালদা নদী, ধুরুং ও বারোমাসিয়া খাল।
লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া: হাঙ্গর নদী, ডলু নদী, সাঙ্গু নদ এবং টংকাবতী খালের বিভিন্ন অংশ।
পটিয়া: চান্দখালী ও হারগাজী খাল।
আনোয়ারা: সাগরের উপকূলীয় বাঁধসহ অন্তত পাঁচটি পয়েন্ট।
বাঁশখালী: জলকদর খালসহ বিভিন্ন খালের পাড় এবং ২৪টি স্লুইসগেট। এছাড়াও রাউজান, হাটহাজারী ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার অন্তত ৩০টি খালের পাড় ভেঙে নতুন করে জনপদ প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্মকর্তার,উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার বলেন,সাম্প্রতিক অতিভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং ভারত থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানির চাপে আমাদের আওতাধীন নদী, খাল ও ছড়ার বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মাঠ পর্যায়ের কারিগরি দল ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ ও স্লুইসগেটের তালিকা প্রস্তুত করেছে।
প্রাথমিক মূল্যায়নে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাছাকাছি। জনবহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। শুষ্ক মৌসুমের জন্য অপেক্ষা না করে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনকবলিত পয়েন্টগুলোতে সাময়িক প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরু করা হয়েছে। এছাড়া, স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত এসব ভাঙন পয়েন্টে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং অকার্যকর স্লুইসগেটগুলো সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন, যাতে আসন্ন বর্ষা বা পাহাড়ি ঢলে পুনরায় বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়।