বন্যার ক্ষত কৃষি ও মৎস্য খাতে শতকোটি টাকার ক্ষতি

আব্দুল্লাহ আল মারুফ, চট্টগ্রাম

সারাদেশ

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার সাত দিন পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চিত্র এখনো বিভীষিকাময়। বন্যার

2026-07-18T10:37:28+00:00
2026-07-18T14:29:14+00:00
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
বন্যার ক্ষত কৃষি ও মৎস্য খাতে শতকোটি টাকার ক্ষতি
আব্দুল্লাহ আল মারুফ, চট্টগ্রাম
শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩৭ এএম  আপডেট: ১৮.০৭.২০২৬ ২:২৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি
টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার সাত দিন পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চিত্র এখনো বিভীষিকাময়। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকট হয়ে উঠেছে দুর্যোগের ক্ষত। বিধ্বস্ত সড়ক, ভেঙে পড়া কালভার্ট, ধ্বংসস্তূপের নিচে তলিয়ে যাওয়া স্বপ্ন-সব মিলিয়ে এক গভীর সংকটে সাতকানিয়াবাসী। 

কৃষি ও মৎস্য খাতে নেমে এসেছে বিপর্যয়, প্রাথমিক তথ্য মতে শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, যার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অবকাঠামোর ভয়াবহ দশা : উপজেলার পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে ডলু ও সাঙ্গু নদীর ভাঙনে যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। পৌর এলাকার উত্তর রামপুর, হাঙরমুখ, গাটিয়াডেঙ্গা ও সামিয়ারপাড়ায় ডলু নদীর ভাঙনে কয়েকশ মিটার সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাজালিয়া ও ছদাহা ইউনিয়নে সাঙ্গু নদীর ভাঙনে মসজিদ ও বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় অন্তত ৪০টি সড়কের ২৫ কিলোমিটার পথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে ছয়টি সড়কের মাধ্যমে। প্রাথমিক হিসেবে অবকাঠামো খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

প্রকৃতির ভয়াবহ রুদ্রমূর্তিতে সবকিছু হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে এওচিয়া ইউনিয়নের তরুণ উদ্যোক্তা ও সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মারুফের। ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যায় তার মৎস্য প্রজেক্টের সব মাছ ভেসে গেছে। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।

ভুক্তভোগী মারুফ জানান, দীর্ঘদিনের জমানো পুঁজি ও ঋণ নিয়ে তিনি মাছের প্রজেক্টটি গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু এবারের বন্যায় তার স্বপ্ন পুরোপুরি তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, "আমার প্রজেক্টের সব মাছ ভেসে গেছে। আমার সব শেষ, আমি এখন নিঃস্ব। সরকারি সহযোগিতা ও পুনর্বাসন সহায়তা ছাড়া আমার পক্ষে আর ঘুরে দাঁড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। স্থানীয় মৎস্য বিভাগ ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি তার অপূরণীয় ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে দ্রুত সরকারি প্রণোদনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।

কৃষি ও মৎস্য খাতে মহাবিপর্যয় : উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ১,৮৯৯ হেক্টর ফসলি জমি বন্যার পানিতে ডুবে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে। এতে ২০ হাজারেরও বেশি কৃষক সর্বস্ব হারিয়েছেন। কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৬০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মৎস্য খাতে ক্ষতির চিত্র আরও ভয়াবহ : ৫৭৫ হেক্টর আয়তনের ৩,৫৫০টি পুকুর ও দিঘি প্লাবিত হয়ে ৮০৬ মেট্রিক টন মাছ এবং ১০ লাখ পোনা ভেসে গেছে। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিসহ মৎস্য খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষি হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রকল্পের সব মাছ ভেসে গেছে। এখন ঘুরে দাঁড়ানোর পুঁজিটুকুও অবশিষ্ট নেই।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, বিভিন্ন দপ্তর প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করেছে। কয়েকটি ইউনিয়নে এখনও পানি পুরোপুরি সরেনি। তাই হিসেব করতে আরও সময় লাগবে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, কৃষক ও মৎস্য চাষিদের সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতি ও সরকারি সহায়তার বিষয়ে বলেন, সাতকানিয়ার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে আমরা মাঠপর্যায়ে জরিপ কার্যক্রম জোরদার করেছি। কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামো খাতের যে ভয়াবহ ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে আমরা প্রতিটি খাতভিত্তিক তালিকা করছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও মৎস্যচাষিদের সরকারি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংস্কার কাজ শুরু করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুর্গত মানুষের পাশে সরকার সব সময় আছে।

ত্রাণের প্রয়োজন, ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই : সরকারি-বেসরকারি ও মানবিক সংগঠনগুলো খাদ্যসামগ্রী ও বিশুদ্ধ পানি নিয়ে এগিয়ে এলেও ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু অর্থমন্ত্রী আমির খসরু,কৃষিমন্ত্রী হারুনুর রশিদ সহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, কেবল ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদী দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট দ্রুত মেরামত এবং কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা কৃষি প্রণোদনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।


  বিষয়:   টানা ভারী বর্ষণ  পাহাড়ি ঢল  ভয়াবহ বন্যা  চট্টগ্রাম  সাতকানিয়া 


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: