কাদা-মাটির নিচে চাপা লাখো মানুষের স্বপ্ন

সুজন দে

সারাদেশ

বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু চট্টগ্রামের বহু মানুষের চোখের পানি এখনো শুকায়নি। যে উঠানে কয়েক দিন আগেও শিশুদের

2026-07-17T14:40:09+00:00
2026-07-17T14:40:09+00:00
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
চট্টগ্রামের বন্যা
কাদা-মাটির নিচে চাপা লাখো মানুষের স্বপ্ন
সুজন দে
শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ২:৪০ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু চট্টগ্রামের বহু মানুষের চোখের পানি এখনো শুকায়নি। যে উঠানে কয়েক দিন আগেও শিশুদের হাসির শব্দ শোনা যেত, সেখানে এখন কাদা, ভাঙা আসবাবপত্র আর নষ্ট হয়ে যাওয়া জীবিকার স্মৃতি। কারও ঘর নেই, কারও ধানের ক্ষেত নেই, কারও গবাদিপশু হারিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনের।ফলে কাদা মাটির নিচে চাপা পড়েছে লাখো মানুষের স্বপ্ন। 

সরকারি সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় চট্টগ্রাম জেলায় ১৫ হাজার ২২৩টির বেশি বসতঘর, ১ হাজার ৩২০ কিলোমিটার সড়ক, ৩৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ১৫ হাজার ৯১০ হেক্টর কৃষিজমির ফসল এবং ১০ হাজারের বেশি গবাদিপশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন বাঁশখালী, পটিয়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার মানুষ। অনেক এলাকায় এখনো কাঁচা ঘরের দেয়াল ধসে পড়ে আছে। কোথাও রান্নাঘর ব্যবহারের অনুপযোগী, কোথাও নলকূপের পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। মানুষ পরিষ্কার পানির সংকট, খাদ্যাভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।

ভোরের ডাকের সংবাদ দাতাদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালীর বাহারছড়া, পটিয়ার নিম্নাঞ্চল কিংবা সাতকানিয়ার গ্রামগুলোর  হাজার হাজার  পরিবার নিজেদের ঘরেই ফিরতে পারেনি। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, আবার কেউ ভাঙা ঘরের এক কোণে প্লাস্টিক টাঙিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। 

কৃষকের গোলার ধান নষ্ট হয়েছে, জেলেদের জাল ভেসে গেছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকানের মালামাল পানিতে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পথও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়। উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়ন প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পাহাড়ি ঢলে এখানকার সড়ক তলিয়ে যায় ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অনেক পরিবার এখনো পানিবন্দি।

এছাড়া ছনুয়া ইউনিয়নের মধুখালী, ছেলবন ও জমিলা পাড়ার বিস্তীর্ণ এলাকা কোমরসমান পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্রচুর মাটির ঘরবাড়ি ও কাঁচা সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।গণ্ডামারা  এলাকায়  জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়। হাজারো পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় চরম খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়ে।

চাম্বল ও চনুয়া অঞ্চলগুলোতে বন্যার পানি খুব ধীরে নামায় দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কাঁচা মাটির ঘর ও মাছের ঘের ভেসে গিয়ে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। শেখারখীল ও শীলকুপ ইউনিয়নেও পানি জমে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। কাঁচা রাস্তাঘাট ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।

সরল ও বৈলছড়ি এলাকার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়। বৈলছড়িতে প্রধান সড়ক ডুবে গিয়ে চট্টগ্রাম শহরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বাঁশখালী অনেক কৃষক বলছেন, জমিতে এখনো কাদা আর বালুর স্তর। ফলে নতুন করে চাষ শুরু করাও সহজ নয়। অন্যদিকে গবাদিপশুর খাদ্যের সংকট এবং রোগবালাই বেড়ে যাওয়ায় খামারিরা নতুন উদ্বেগে পড়েছেন। স্কুলের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকায় শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

এছাড়া  সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে ও সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এই এলাকাগুলো তলিয়ে যায়।সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে,নলুয়া, বাজালিয়া,কেঁওচিয়া,কালিয়াইশ, ধর্মপুর, মাদার্শা, খাগরিয়া,সোনাকানিয়া ইউনিয়ন। 

এইসব এলাকায় হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মৎস্য খামার ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুর্গত এলাকায় চাল, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, শিশু খাদ্য এবং নগদ সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। 

পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, চিকিৎসা সেবা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত মেরামত এবং কৃষকদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে পুনর্গঠনের কাজও শুরু হয়েছে।

তবে দুর্গত মানুষের অনেকের অভিযোগ, দুর্গম এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পৌঁছেনি। বিশেষ করে যেসব পরিবার সম্পূর্ণভাবে ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু ত্রাণ নয়, নতুন ঘর নির্মাণ, কৃষি পুনরুদ্ধার এবং জীবিকা ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে শুধু বন্যার পর ত্রাণ বিতরণ যথেষ্ট নয়। নদী ও খাল-নালা নিয়মিত খনন, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, অবৈধ দখলমুক্ত জলপ্রবাহ নিশ্চিত করা, পাহাড় কাটা বন্ধ করা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। একই সঙ্গে আগাম আবহাওয়া ও বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা এবং স্থানীয় জনগণকে দুর্যোগ প্রস্তুতি বিষয়ে প্রশিক্ষিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চট্টগ্রামের মতো উপকূলীয় ও পাহাড়ঘেরা অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। 

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এখন সময় এসেছে বন্যাকে শুধু মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করার।


  বিষয়:   চট্টগ্রাম  বন্যা  পানি  গবাদিপশু 


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: