চট্টগ্রাম মহানগরীর যানজট নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একের পর এক সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত ও সড়ক দখল এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে সেই উন্নয়নের সুফল পাচ্ছেন না নগরবাসী। চার লেনের অনেক সড়কই এখন কার্যত দুই বা এক লেনে পরিণত হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে যানজট ও ভোগান্তি।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিমতলা থেকে অলংকার মোড় পর্যন্ত পোর্ট কানেক্টিং রোডের বিভিন্ন অংশে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনারবাহী প্রাইম মুভার দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকায় স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগ সহজ করতে নির্মিত চার লেনের এই সড়কের বড় অংশই এখন অবৈধ পার্কিংয়ের দখলে।
একই চিত্র দেখা গেছে পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত আউটার রিং রোডেও। নগরীর যানবাহনের চাপ কমাতে নির্মিত এই সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে শত শত ভারী যানবাহন। ফলে সড়কটি অনেকটা অস্থায়ী ট্রাক টার্মিনালে রূপ নিয়েছে। পতেঙ্গা, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ড্রাইডক ও জ্বালানি তেল ডিপোগামী সড়কেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।
এছাড়া সিডিএ অ্যাভিনিউ, শেখ মুজিব রোড, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড, মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়ক, অলংকার-দেওয়ানহাট সড়ক, বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোড, আন্দরকিল্লা-নিউমার্কেট সড়ক, সিরাজউদ্দৌলা রোড, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বায়েজিদ বোস্তামী, কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে কালুরঘাট, অক্সিজেন-কুয়াইশ, সাগরিকা, হালিশহর ও কাট্টলীসহ নগরীর প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কেই অবৈধ পার্কিং ও দখলের চিত্র দেখা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যানজট কমাতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বিভিন্ন সময়ে সরু সড়ক চার লেনে উন্নীত করেছে, নির্মাণ করেছে মিডিয়ান, প্রশস্ত ফুটপাত ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা। বিভিন্ন মোড় উন্নয়নেও ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ। তবে অবৈধ দখল ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে এসব প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি।
ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান দখল করে রেখেছে সড়কের একাধিক লেন, কোথাও ফুটপাত ও রাস্তার অংশ দখল করে বসেছে হকার, আবার কোথাও নির্মাণসামগ্রী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালামাল পড়ে থাকায় পথচারীদের সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে, তেমনি যানজটও তীব্র হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরীতে ভারী যানবাহনের জন্য পর্যাপ্ত ট্রাক টার্মিনাল বা হোল্ডিং ইয়ার্ড না থাকায় চালকরা বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশেই যানবাহন পার্ক করেন। বিশেষ করে বন্দর, ইপিজেড, আইসিডি ও শিল্পাঞ্চলমুখী সড়কগুলোতে এ সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। এর সঙ্গে নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অন্যদিকে নিউমার্কেট, জিইসি মোড়, ওয়াসা মোড়, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, চাক্তাই, রাজাখালী, রহমতগঞ্জ ও আসকার দীঘির পাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতজুড়ে দোকান ও ভাসমান ব্যবসা থাকায় পথচারীদের নিরাপদ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু রাস্তা প্রশস্ত করলেই যানজট কমে না। সড়ক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর পার্কিং নীতিমালা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, হকার পুনর্বাসন এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদ—এসব একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাদের মতে, সড়ককে দখলমুক্ত রেখে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে চট্টগ্রাম নগরীর যান চলাচল অনেক বেশি গতিশীল হবে।