দীর্ঘদিন ধরে খোয়াই নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ, স্থানীয়দের একের পর এক প্রতিবাদ এবং লিখিত আবেদন কোনোটিই থামাতে পারেনি বালু লুট। শেষ পর্যন্ত এর ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর, পইল ও আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষকে। খোয়াই নদীর তীররক্ষা বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে প্রায় অর্ধশত গ্রাম। পানিবন্দি হয়েছেন হাজারো মানুষ। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও সবজিক্ষেতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এ বিপর্যয়ে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এ ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন লস্করপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, সময়মতো প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ থাকলে এত বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো।
বাঁধ ভাঙার ঘটনার পর অবশেষে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গতকাল পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. সামিউল আজম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় মেসার্স শামীম বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. ইকবাল হোসেন এবং শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুদিয়াখলা গ্রামের হাজী আব্দুল হামিদের ছেলে মামুনুর রশিদকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ১১ জুলাই শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার আলাপুর আশ্রয়ন প্রকল্পসংলগ্ন খোয়াই নদীতে ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সময় পাউবোর কর্মকর্তা, সহকারী রেভিনিউ অফিসার শাহাদাত হোসেন এবং শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আরিফুর রহমান শান্ত যৌথভাবে অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
এজাহার অনুযায়ী, ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত চুক্তিতে নির্ধারিত সীমানার বাইরে আর.এস. ৫৭৫ ও ৪০১ নম্বর দাগ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। এছাড়া কোনো অনুমতি ছাড়াই স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুমের মালিকানাধীন জমি কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগও আনা হয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে বালু উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও রাতের বেলায়ও বালু উত্তোলন করা হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলায় আরও বলা হয়, ড্রেজারের পাইপ প্রবেশ করানোর জন্য তীররক্ষা বাঁধে ছিদ্র করা হয়, নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত করা হয় এবং নদীর ঢালের (স্লোপ) সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়নি। এসব অনিয়মের ফলেই গত ৯ জুলাই লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর তীররক্ষা বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয় এবং কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
অভিযান পরিচালনার সময় অভিযুক্তরা পালিয়ে গেলেও ঘটনাস্থল থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত দুটি ড্রেজার মেশিন ও বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়।
অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, মাহবুব মিয়া, ফজর আলী ও আব্দুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে কালীগঞ্জ বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে আসছিলেন। এতে বাঁধটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে তারা একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পাশাপাশি মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করেছেন। কিন্তু অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ এই দুর্যোগ নেমে আসে।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু মামলা দায়ের করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। অবৈধ বালু উত্তোলন ও বাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত তীররক্ষা বাঁধ দ্রুত স্থায়ীভাবে সংস্কার, দুর্গত মানুষের পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে খোয়াই নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন রোধে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এবিষয়ে বালু উত্তোলনকারী শামীম বিল্ডার্সের মালিক ইকবাল হোসেনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।