শেষের দিকে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ খ্যাত ফিফা বিশ্বকাপ। শিরোপা লড়াইয়ে প্রথম সেমিতে মুখোমুখি ফ্রান্স ও স্পেন। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের আর্লিংটনে অবস্থিত ডালাস স্টেডিয়ামে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে। টুর্নামেন্টে টিকে থাকা দুই সেরা দলের এই লড়াইকে অনেকেই ফাইনালের আগেই ফাইনাল বলে অভিহিত করছেন।
এবারের বিশ্বকাপে শেষ বত্রিশ, শেষ ষোলো, শেষ আটে; নকআউটের কোনো ম্যাচে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হয়নি তাদের। মোটের উপর গতি দিয়ে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিচ্ছে ফ্রান্স। দাপুটে ফুটবলে শতভাগ জয় নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে তারা।
আসরে সবচেয়ে শক্তিশালী আক্রমণভাগের একটি ফ্রান্সের। গত ছয় ম্যাচে, প্রতিপক্ষের জালে ১৬ গোল করে দলটি দেখিয়েও দিয়েছে নিজেদের সামর্থ্য। স্পেনের আক্রমণভাগও দুর্বল নয় মোটেও; সেরা চারে তারা উঠে এসেছে ১১ গোল করে। পরিসংখ্যানের এই পাতায় ফ্রান্স এগিয়ে থাকলে, গোল কম হজমের পাতায় এগিয়ে স্পেন। ছয় ম্যাচে তারা খেয়েছে মাত্র একটি। এর অর্থ, বাকি পাঁচ ম্যাচে ক্লিনশিট নিয়ে মাঠ ছাড়ে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এবার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দল দুটি। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় শুরু হবে ম্যাচটি।
দুই দলের খেলার ধরনই ভিন্ন। ফ্রান্সের শক্তির জায়গা গতি, আর স্পেনের ছন্দ। প্রথম সেমিফাইনালে ফরাসিদের মুখোমুখি হওয়ার আগে, প্রতিপক্ষের গতিময় ফুটবল নিয়ে সতর্ক লুইস দে লা ফুয়েন্তে। তাই বলে নিজেদের কৌশলে বদল আনার পক্ষে নন তিনি। স্বাভাবিক খেলাটা খেলেই অতীতের মতো এবারও ফ্রান্সকে হারাতে আত্মবিশ্বাসী স্পেন কোচ।
এই ম্যাচের আগে ঘুরে ফিরে আসছে দল দুটির সবশেষ কয়েকটি মুখোমুখি লড়াই। ২০১৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও গত আসরের রানার্সআপ দলটির যে, স্পেনের বিপক্ষে সাম্প্রতিক সাক্ষাতের স্মৃতি সুখকর নয় মোটেও। ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ চারে ও নেশন্স লিগের সেমিফাইনালে স্প্যানিশদের বিপক্ষে হেরেছিল দিদিয়ে দেশমের দল।
গত দুই বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট, ২০১৮ আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে এবারও মনে করা হচ্ছে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার। তবে ফেভারিটদের তালিকায় আছে স্পেনও। ২০১০ আসরের চ্যাম্পিয়নদের আসরের শুরুটা কিছুটা অপ্রত্যাশিত হলেও, সময়ের সঙ্গে ছন্দ খুঁজে পেতে শুরু করেছে তারা।
নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচ গোলশূন্য ড্র করে স্পেন। পরে সৌদি আরব ও উরুগুয়েকে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয় তারা। এখন পর্যন্ত কোনো নকআউট ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হয়নি তাদেরও। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ডালাসে কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসেদের মুখোমুখি হবে স্পেন। তিন বছরের মধ্যে ফরাসিদের বিপক্ষে স্প্যানিশদের এটি তৃতীয় লড়াই। সবশেষ দুটিতেই হেসেছিল দে লা ফুয়েন্তের দল। ২০২৪ সালে ইউরোর সেমিফাইনালে ও পরের বছর নেশন্স লিগের সেমিফাইনালে জয় পায় স্পেন।
ফ্রান্সের বিপক্ষে গত দুই ম্যাচের সাফল্য স্বাভাবিকভাবেই আত্মবিশ্বাস যোগাচ্ছে স্পেনকে। তবে বর্তমান ফরাসি দলকে একটু ভিন্ন চোখেই দেখছেন স্পেনের ইউরো জয়ী কোচ দে লা ফুয়েন্তে। যেকোনো প্রতিযোগিতার এই পর্যায়ে, ফ্রান্স সবসময়ই শিরোপার প্রধান দাবিদারদের একটি। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা অনেক কঠিন। সব প্রতিপক্ষই ভীষণ শক্তিশালী থাকে, দল হিসেবে আমরাও যথেষ্ট শক্তিশালী। ফাইনালের পথ এখন উন্মুক্ত।
দুই বছর আগের কথা? তারা এখন পুরোপুরি ভিন্ন এক দল। অনেক খেলোয়াড় আগে থেকেই দলে থাকলেও, এটা একদমই ভিন্ন একটা সময়। খেলার ধরন এবং কৌশল- উভয় ক্ষেত্রেই অনেক পরিবর্তন দেখা যাবে। আমার মনে হয় দুটি দলই আগের চেয়ে উন্নতি করেছে।
দে লা ফুয়েন্তের মতে, ভিন্ন দুই বৈশিষ্ট্যের দল মুখোমুখি হবে এবারের বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে। প্রতিপক্ষের শক্তি-সামর্থ্য, নিজেদের দুর্বলতা; সবই জানা স্পেন কোচের। ফ্রান্সের বিপক্ষে নিজেদের ধরনেই আস্থা রাখছেন তিনি।
পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বলেছিলাম, প্রায় একই বৈশিষ্ট্যের দুটি দল মুখোমুখি হবে। এই ম্যাচের ক্ষেত্রে, আমরা সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা গতিময় ফুটবলে স্বচ্ছন্দ, তাই আমাদের নিজেদের খেলার ধরনটাই বজায় রাখতে হবে। জানি আমাদের দুর্বলতা আছে, মাঝেমধ্যে রক্ষণ একটু বেশিই অরক্ষিত হয়ে যায়। আমাদের অসাধারণ রক্ষণভাগ রয়েছে এবং আমরা একটি দলগত ভারসাম্য খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি। ফ্রান্সের শক্তি সম্পর্কে আমরা জানি, তবে আমাদের নিজেদের পরিকল্পনায় অবিচল থাকতে হবে। আমরা কোনো নির্দিষ্ট ছকে আটকে থাকা দল নই। কিছু পরিবর্তনের দরকার হলে সেটি অবশ্যই করা হবে। নিজেদের ধরনে খেলেই ফ্রান্সের বিপক্ষে সবশেষ দুটি ম্যাচ জিতেছি।
ওই দুই আসরের মধ্যে, ইউরোতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। নেশন্স লিগে হয়েছিল রানার্সআপ। ২০১০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জেতা ‘লা রোজা’রা এবার দ্বিতীয়বার এই স্বাদ নিতে মুখিয়ে। সব বিভাগে নির্ভযোগ্য ফুটবলার থাকায় দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ দল স্পেন; তাদের রক্ষণ প্রতিপক্ষের জন্য রীতিমতো দূর্ভেদ্যই। কোয়ার্টার-ফাইনালে এসে বেলজিয়াম কেবল সেখানে পেরেছে একটু চিড় ধরাতে।
কিলিয়ান এমবাপে, মাইকেল ওলিসে, উসমান দেম্বেলেকে নিয়ে স্পেনের আক্রমণভাগ ধারাল, ক্ষিপ্র। লামিন ইয়ামাল, মিকেল ওইয়ারসাবালের উপস্থিতিতে স্পেনের অ্যাটাকিং লাইন-আপ অতটা গতিময় না হলেও, দলের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে দারুণ কার্যকরী।
তাই ইব্রাহিমা কোনাতে, দাইয়ু উপামেকানোদেরও ডালাসের ডামাডোলে দৃঢ়তার পরীক্ষা দিতে হবে। ফরাসি সেন্টার-ব্যাক কোনাতে প্রত্যয়ের সুরে বললেন, প্রস্তুত তারা।
আপনি কাউকে ভয় পেতে পারেন না। এখন আমরা সম্ভাব্য সেরা উপায়ে প্রস্তুতি নিব এবং আশা করি, ম্যাচের ফল দিন শেষে আমাদের পক্ষে আসবে। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যনির্ভর খেলোয়াড়দের নিয়ে স্পেন ব্যতিক্রমী একটা দল। তো, আমরা কেবল একজন খেলোয়াড়ের দিকে মনোযোগ দিচ্ছি না, যদিও লামিন (ইয়ামাল) দুর্দান্ত একজন খেলোয়াড়। নরওয়ের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বদলি নেমেছিলেন কোনাতে। রক্ষণে তার চেয়ে দেশমের বেশি পছন্দ উপামেকানো ও উইলিয়াম সালিবা। পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে মুখিয়ে থাকা ফ্রান্সের রক্ষণভাগ আগলে রাখার দায়িত্ব তাদের ঘাড়ে। তবে, মাটিতে পা রাখতেন চান কোনাতে। পরিসংখ্যান বা ইতিহাসের চক্করেও পড়তে চান না তিনি কোনোভাবেই। ইয়ামাল-ওইয়ারসাবালদের ফাঁদে ফেলার পথ অবশ্য খুঁজতে হবে ফ্রান্সকে। আরেক সেন্টার-ব্যাক মাক্সোস লাকোয়াও বিগত ম্যাচের পরিসংখ্যান টেনে, স্পেনকে নিয়ে কথা বললেন সমীহের সুরে। তবে, তিনিও পাত্তা দেননি ভয়-ভীতি পাওয়ার বিষয়টি।
আমি ‘ভয়’ শব্দটা বলব না, কিন্তু তাদের মান নিয়ে আমরা সতর্ক। কেপ ভার্দের বিপক্ষে লড়াই ছাড়া, তারা তাদের সব ম্যাচ জিতেছে। তো, আমরা তাদের শ্রদ্ধা করি। তাদের দলে উঁচু মানের খেলোয়াড় আছে, কিন্তু আমরা জিততে চাই। চলতি আসরে স্পেনের ‘বিস্ময়বালক’ ইয়ামাল অবশ্য এখনও আছেন নিজের ছায়া হয়ে। তার পাশে এখন পর্যন্ত স্রেফ এক গোল। একটু বেমানানই। ওইয়ারসাবাল দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৪টি)। লাকোয়া অবশ্য ১৮ বছরের টগবগে তরুণ ইয়ামালকে নিয়ে সতর্ক। আমরা ভালোভাবে, সেরা উপায়ে রক্ষণ সামলাবো।
লামিন খুবই ভালো একজন খেলোয়াড় এবং এই বিশ্বকাপে দেখিয়েছে, সে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে পারে। (তাকে আটকাতে) যা যা করা দরকার, সেটাই করব আমরা। এদিকে ফ্রান্স ও স্পেনের সেমিফাইনাল ম্যাচকে সামনে রেখে ডালাস স্টেডিয়ামে প্রস্তুতিমূলক কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
নীল জার্সিধারী ফ্রান্স অনায়াসে শেষ চারে উঠেছে। তাদের অলস্টার আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে, যিনি ছয় ম্যাচে ইতোমধ্যে আটটি গোল করেছেন। এমবাপের পাশে রয়েছেন বায়ার্ন মিউনিখ তারকা মাইকেল ওলিসে, ব্যালন ডি’অরজয়ী ওসমানে দেম্বেলে এবং প্যারিস সেইন্ট-জার্মেইর জুটি ব্র্যাডলি বারকোলা ও ডিসায়ার ডুয়ে।
অন্যদিকে লাল জার্সিধারী স্পেন লুইস ডি লা ফুয়েন্তের অধীনে নিজেদের পরিচিত বল দখলের পারদর্শীতা, সুযোগ বুঝে প্রতিপক্ষের রক্ষনভাগে কৌশলী আক্রমন চালানো ও দুর্দান্ত প্রতিভাবান স্কোয়াড নিয়ে ঠান্ডা মাথায় সেমিফাইনালে উঠে এসেছে। ফ্রান্স যেখানে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ঝলকে এগিয়েছে, সেখানে স্পেন নির্ভর করেছে দলগত শক্তির ওপর। রদ্রি, পেদ্রি ও ফাবিয়ান রুইজের নিখুঁত পাসিংয়ের ওপর গড়ে ওঠা তাদের সুসংগঠিত মিডফিল্ড টিনএজার উইঙ্গার লামিন ইয়ামালের জন্য নিয়মিত সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
ফলে এটি হতে যাচ্ছে দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের এক ক্লাসিক লড়াই। স্পেন বলের দখল ধরে রেখে এমবাপে ও তার সতীর্থদের কাছে বল পৌঁছানোর পথ বন্ধ করার চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে তারা চাপ সৃষ্টি করতে চাইবে ফ্রান্সের রক্ষণভাগের ওপর, যাদের এখন পর্যন্ত এই টুর্নামেন্টে খুব বেশি কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়নি। যদিও কাজটি সহজ হবে না, তবু সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে নিজেদের রেকর্ড থেকে আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে স্পেন।
গত বছর উয়েফা নেশনস লিগের রোমাঞ্চকর ম্যাচে স্পেন ৫-৪ গোলে ফ্রান্সকে হারিয়েছিল। এর আগে ইউরো এর সেমিফাইনালেও ২-১ ব্যবধানে জিতে পরে শিরোপা জয় করে তারা।
দেশমের অধীনে তিনটি বিশ্বকাপের মধ্যে দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা ফরাসি দলে স্পষ্ট লক্ষ্য ও ঐক্যের ছাপ দেখা যাচ্ছে। এই বিশ্বকাপ শেষেই কোচের পদ ছাড়বেন দেশ্যম। বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা তৃতীয় সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে ফ্রান্স।
এর আগে কেবল জার্মানি (১৯৮২-১৯৯০ এবং ২০০২-২০১৪) ও ব্রাজিল (১৯৯৪, ১৯৯৮ ও ২০০২) এই কৃতিত্ব দেখিয়েছে। তবে আধুনিক ফুটবলে ফ্রান্সকে পরাশক্তিতে পরিণত করার কৃতিত্ব নিজের বলে মানতে নারাজ দেশম।
গত সপ্তাহে সাফল্যের রহস্য জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, সম্ভবত খুব ভালো খেলোয়াড় থাকার কারণেই। তবে মনে হয় আমি আমার কাজটাও খুব খারাপ করছি না। দেশমের প্রতি সেই ভালোবাসার প্রতিফলন দেখা গেছে খেলোয়াড়দের আচরণেও। গ্রুপ পর্বের মাঝপথে মায়ের মৃত্যুর কারনে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন দেশম। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ গ্রুপ ম্যাচে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। এক ম্যাচ পর আবারও তিনি দলের সাথে যোগ দেন।