হবিগঞ্জ সদর উপজেলার খোয়াই নদীর তীররক্ষা বাঁধ ভাঙার ঘটনায় প্রশাসন দুটি ড্রেজার মেশিন জব্দ করলেও অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। একই সঙ্গে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকার চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খোয়াই নদীর চরহামুয়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার বসিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন চলছিল। এতে নদীর তীররক্ষা বাঁধ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করলে বালু উত্তোলনকারী ঠিকাদার মো. ইকবাল হোসেন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হবিগঞ্জ সদর থানায় তাদের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ এনে মামলা করেন। এ ঘটনায় অনেকেই আতঙ্ক ও হয়রানির আশঙ্কায় পরবর্তীতে প্রতিবাদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্তদের স্বজন ও স্থানীয়দের দাবি, তারা কোনো ধরনের চাঁদা দাবি করেননি। বরং ভয়াবহ নদীভাঙন রোধ এবং জনপদ রক্ষার স্বার্থে অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদ করেছিলেন। সেই প্রতিবাদের জেরেই তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু উত্তোলনকারী চক্রকে স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা করেছেন লস্করপুর এলাকার নুরুল হকের ছেলে আফরোজ মিয়া, আদ্যপাশা এলাকার মোজাক্কর উল্লার ছেলে সিদ্দিক মিয়া এবং আলতাবুর রহমানের ছেলে মোখলেসুর রহমান। মামলায় তাদের আহত সাক্ষী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে তারা ড্রেজার কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করছেন। তাদের দাবি, চাঁদাবাজি বা মারামারির কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
এদিকে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে সম্প্রতি খোয়াই নদীর কালীগঞ্জ এলাকায় তীররক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণেই বাঁধটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়।
ঘটনার পর শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে দুটি ড্রেজার মেশিন জব্দ করে এবং নিয়মিত মামলা দায়েরের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নির্দেশনা দেয়। তবে অভিযানের পর থেকেই বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নিজেদের রক্ষায় বিভিন্ন মহলে তদবির চালানোর অভিযোগও উঠেছে।
চাঁদাবাজি মামলার সাক্ষী এবং স্থানীয়ভাবে ড্রেজার কার্যক্রমের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে অভিযুক্ত আফরোজ মিয়া বলেন, ‘আমি শুধু ড্রেজারে উত্তোলিত বালু রাখার জন্য জমি ভাড়া দিয়েছি। চাঁদাবাজি বা আমার ওপর হামলার কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
মামলার অপর সাক্ষী সিদ্দিক মিয়াও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে বলেন, চাঁদাবাজি বা হামলার কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
এ বিষয়ে বালু উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান শামীম বিল্ডার্স-এর মালিক মো. ইকবাল হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু ড্রেজার জব্দ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।