জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বগতি আর মেঘনা নদীতে কাঙ্ক্ষিত মাছের তীব্র সংকট—এই দুই সংকটে চাঁদপুর, হাইমচর ও মতলব উত্তর উপজেলার জেলেদের জীবন-জীবিকা এখন চরম অনিশ্চয়তায়। ইলিশের ভরা মৌসুমেও মাছ না পেয়ে অনেকেই ধার-দেনায় জড়িয়ে পড়ছেন। একদিকে পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দেয়া অন্যদিকে মহাজন ও বিভিন্ন এনজিওর কিস্তির টাকার চাপে অনেক জেলে পেশা বদল করে এখন অন্য পেশায় চলে গেছেন। কেউ কেউ দেনা পরিশোধের চাপে ঘর-বাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন জেলায় পালিয়ে অন্য পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিল্প-কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্যে নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ের পানি দূষিত হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দিন দিন কমছে দেশীয় মাছের উৎপাদন। বারবার জাল ফেলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত মাছ।
একসময় মেঘনা নদী ও আশপাশের খাল-বিলে শোল, বোয়াল, টেংরা, পুঁটি, কই, শিং, পাবদা, বাতাসি, কাজলি, ফলি, চাপিলা, রুই, কাতলা, চিতল, বাইম, আইড় ও চিংড়িসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এসব মাছ বিক্রি করেই স্বচ্ছলভাবে সংসার চালাতেন জেলেরা। কিন্তু দূষণ, নদীর পরিবর্তিত চরিত্র এবং প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে এসব মাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বাজারেও দেশীয় মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
একই চিত্র দেখা গেছে চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটে। ইলিশের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় হতাশ সাধারণ ক্রেতারা। চাঁদপুরের ইলিশের বিশেষ চাহিদার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা এলেও অতিরিক্ত দামের কারণে অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, মৌসুমের এ সময়ে ঘাটে প্রতিদিন অন্তত এক হাজার মণ ইলিশ আসার কথা থাকলেও বর্তমানে আসছে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ মণ। সরবরাহ কম থাকায় দামও বেড়েছে।
এদিকে একসময় উন্মুক্ত থাকা খাল-বিল প্রভাবশালীদের ইজারার আওতায় চলে যাওয়ায় সেখানে মাছ ধরার সুযোগও হারিয়েছেন জেলেরা। নদীতে মাছের সংকটের পাশাপাশি বিকল্প জলাশয়ে প্রবেশাধিকার না থাকায় অনেক পরিবার অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।
হাইমচর উপজেলার পশ্চিম চর কৃষ্ণপুর গ্রামের জেলে নজির ভূঁইয়া বলেন, আমার বাপ-দাদারা মেঘনা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। আমিও দীর্ঘদিন একই পেশায় ছিলাম। কিন্তু এখন নদীতে জাল ফেলেও মাছ পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে জাহাজে মালামাল ওঠানো-নামানোর কাজ করছি। আমার মতো শত শত জেলে এখন অন্য পেশায় চলে গেছেন।
সরেজমিনে মেঘনা নদীর বিভিন্ন ঘাট ঘুরে দেখা যায়, আগের মতো জেলেদের ব্যস্ততা নেই। ঘাটে সারিবদ্ধ নৌকা কিংবা জালও চোখে পড়ে না। অধিকাংশ জেলেই জীবিকার সন্ধানে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ রাজমিস্ত্রি, আবার কেউ কাঠমিস্ত্রির কাজ করছেন। যারা এখনও মাছ ধরছেন, তাদের আয়ও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
জেলে বিল্লাল কাজী বলেন, নৌকা আর জাল—কিছুই এখন আর নেই। সেই দিনগুলো এখন শুধু স্মৃতি। মাঝেমধ্যে দিনমজুরের কাজ পাই, না হলে বেকার থাকতে হয়। কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি।
হাইমচর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা এ.বি.এম. আশরাফুল হক বলেন, নদীর বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠা, নদীর গতিপথ পরিবর্তনসহ প্রাকৃতিক নানা কারণে কিছু সময় ইলিশের আহরণ কমেছিল। তবে বর্তমানে আহরণের হার ধীরে ধীরে বাড়ছে। এছাড়া ইলিশ ছাড়া অন্যান্য দেশীয় মাছের আবাসস্থলও প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে ধ্বংস হচ্ছে। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি ফাঁদের অবাধ ব্যবহারের কারণেও মৎস্যসম্পদের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এসব অবৈধ জালের বিরুদ্ধে মৎস্য অধিদপ্তরের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। পুকুর ও জলাশয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণে প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।