টানা বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কুমিল্লার গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। আগাম জাতের মুলা, লাউ, চিচিঙ্গা, চালকুমড়া, ডাঁটা শাকসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজির ক্ষেত পানিতে ডুবে যাওয়ায় হাজারো কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই পরিপক্ব হওয়ার আগেই ক্ষেত থেকে সবজি তুলে বাজারে বিক্রির চেষ্টা করছেন।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে বুড়িচং উপজেলার বালিখাড়া, ভান্তি ও কামারখাড়া চরাঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত পানির নিচে চলে গেছে। কোথাও কোথাও পানির ওপর ভাসছে সবজির গাছ। কৃষকরা কোমরসমান পানিতে নেমে যা সম্ভব ফসল তুলে আনার চেষ্টা করছেন। তাদের আশঙ্কা, আরও দুই-একদিন পানি স্থায়ী হলে কাদার নিচে চাপা পড়ে চারাগাছ নষ্ট হয়ে যাবে।
ভান্তি এলাকার কৃষক আবদুল হক জানান, প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে আগাম জাতের মুলা ও লাউ চাষ করেছিলেন। হঠাৎ গোমতীর পানি বেড়ে যাওয়ায় পুরো জমি পানির নিচে চলে গেছে। দীর্ঘ সময় পানি থাকলে সব চারা নষ্ট হয়ে যাবে।
একই এলাকার কৃষক আবদুল জলিল বলেন, ডাঁটা শাক, পুঁইশাক ও চালকুমড়ার ক্ষেত তলিয়ে গেছে। শুধু তার নয়, ভান্তি, কামারখাড়া, বালিখাড়াসহ আশপাশের এলাকার শতাধিক কৃষকের ফসল ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কৃষক সোহেল মিয়া বলেন, লাউ, চিচিঙ্গা, মুলা ও বিভিন্ন সবজি অপরিপক্ব অবস্থায় তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব বিক্রি করে অন্তত কিছু ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন তারা। তবে বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা ও দাম নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, উজানের পাহাড়ি ঢলে গোমতী নদীর পানি বাড়ায় বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের ফসল তলিয়ে গেছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করছেন। জরিপ শেষে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ৯টায় গোমতী নদীর পানি ৮ দশমিক ৫৯ মিটারে ছিল, যা বিপৎসীমা ১১ দশমিক ৩০ মিটারের অনেক নিচে। আগের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ৯৩ মিটার পর্যন্ত উঠলেও পরে তা কমে আসে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, নদীর পানি বাড়লেও এখনো তা বিপৎসীমার অনেক নিচে রয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আপাতত আতঙ্কিত হওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি।
তবে নদীর পানি বাড়তে থাকায় আদর্শ সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া ও দেবিদ্বার উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিচু জমিতে পানি প্রবেশ করেছে। কোথাও কোথাও পুরো সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে।
২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনকে। ওই বছরের আগস্টে ভারতীয় পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে বুড়িচং উপজেলার বুড়বুড়িয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে শত শত গ্রাম প্লাবিত হয়। প্রাণ হারান ১৪ জন, ব্যাপক ক্ষতি হয় ঘরবাড়ি, সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমির।
বুড়িচং উপজেলার ইছাপুরা এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রব বলেন, ২০২৪ সালের বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেই মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। আবার বড় ধরনের বন্যা হলে সাধারণ মানুষের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে সদর উপজেলার ডুমুরিয়া চাঁনপুর এলাকার বাসিন্দা আনাস রহমান বলেন, চরের জমিতে নতুন করে সবজির চারা লাগিয়েছিলেন। কিন্তু পানি বাড়তে থাকায় সেগুলো পরিপক্ব হওয়ার আগেই তুলে নিতে হচ্ছে।
এদিকে জেলা প্রশাসক মিজ রোজী আক্তার জানিয়েছেন, বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি না হলেও প্রশাসন সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে। পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।