বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষবারের মতো নামলেও স্বপ্নের সমাপ্তি হলো না ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর। শিরোপার অধরা আক্ষেপ নিয়েই অশ্রুসিক্ত চোখে বিশ্বকাপকে বিদায় জানালেন পর্তুগিজ মহাতারকা। ম্যাচ শেষে তার আবেগঘন বিদায় কোটি ভক্তকেও কাঁদিয়েছে, আর এর মধ্য দিয়েই বিশ্ব ফুটবলের এক গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কোমরে হাত, মুখে হতাশার চাপ, দৃষ্টি শূন্যে। কেউ কেউ এসে তাকে সান্ত্বনা দিলেন, পিঠ চাপড়ে দিলেন, জড়িয়ে ধরলেন। তিনি সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। ক্যামেরায় খুব কাছ থেকে ধরা হলো তার চোখজোড়া। সেখানে টলমল করছে জল। লুকানোর চেষ্টা করলেন কি না, বোঝা গেল না। এক পর্যায়ে তা বেরিয়েই এলো।
রোনালদো কাঁদলেন। আবারও। গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনা মরক্কোর কাছে হেরেও এভাবে কান্নায় মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি। নিজের শেষ বিশ্বকাপেও চোখের জলে ভেসেই বিদায় হলো কিংবদন্তির। এবার তো পথচলা থেমে গেল কোয়ার্টার-ফাইনালের আগেই।
ব্যক্তিগত কিছু রেকর্ড-অর্জন তার এবারও হয়েছে। দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন। প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করেছেন। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রথম গোলের দেখা পেয়েছেন। সেই গোলে নকআউটে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোলের ইতিহাস গড়েছেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ শিরোপার ধারেকাছেও যেতে পারেননি।
বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়ে সেই হতাশা রোনালদোর আছে। তবে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার তৃপ্তি তার সঙ্গী।
এভাবে বিশ্বকাপ ছেড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিকভাবেই দুঃখজনক। কিন্তু যেমনটা আমি গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলাম, আমার সর্বস্ব দিয়েছি, নিজের সেরাটা দিয়েছি। এবং আমি স্বচ্ছ ভাবনা নিয়েই বিদায় নিচ্ছি।
এটাই ফুটবল, এটাই একজন ফুটবলারের জীবন। কখনও জয় আসে, কখনও পরাজয়। সবকিছুর মধ্যেও জীবনকে এগিয়ে নিতেই হয়।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচটির আগেই পর্তুগাল অধিনায়ক নিশ্চিত করেছেন, বিশ্বকাপে তার দেখা যাবে না তাকে। তবে এখনই জাতীয় দলকে বিদায় জানাবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেননি আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাসের সফলতম গোলস্কোরার।
হ্যাঁ, এটা আমার শেষ বিশ্বকাপ ছিল, কিন্তু বাকিটা... আমার ভাবনার ব্যাপার আছে, পরিবারের সঙ্গে কথা বলার ব্যাপার আছে। উত্তেজনার বশে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কিছু নেই। জীবন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় আছে। হুট করে সিদ্ধান্ত নেব না।
ছয়টি বিশ্বকাপ খেললেও ফাইনাল খেলার স্বাদ ছাড়াই শেষ হচ্ছে বিশ্ব আসরে তার অধ্যায়। বিশ্বকাপে অভিষেক আসরে সেমি-ফাইনালে খেলেছিলেন। সেটিই বিশ্ব আসরে রোনালদোর সেরা সাফল্য। পরের পাঁচ আসরের তিনবার বিদায় নিতে হলো শেষ ষোলো থেকে। একবার বিদায় নিয়েছেন গ্রুপ পর্ব থেকেই, আরেকবার কোয়ার্টার-ফাইনাল থেকে।
তবে এই অপ্রাপ্তির গল্পের অন্য ছবিটাও তুলে ধরছেন তিনি, যেখানে মিশে আছে ইতিহাস গড়া ও নিজের দেশকে বিশ্ব ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত করার তৃপ্তি।
ক্রিশ্চিয়ানোর আগে পর্তুগাল কোনো শিরোপা জেতেনি। আমি জিতেছি তিনটি ট্রফি। সেদিক থেকে আমি খুশি। সত্যিটা হলো, জাতীয় দলের হয়ে আমার সবচেয়ে বড় শিরোপাটি ছিল ২০১৬ ইউরো, যা আমার কাছে সত্যি বলতে বিশ্বকাপের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ।
তাই আবারও বলছি, নিজের সেরাটা দিয়ে, স্বচ্ছ বিবেক নিয়ে বিদায় নিচ্ছি এবং এটাই শেষ। আগামীকাল একটি নতুন দিন আসবে, জীবন চলতে থাকবে।”
সৌদি প্রো লিগের ক্লাব আল-নাসরের সঙ্গে আরও এক মৌসুমের জন্য চুক্তিবদ্ধ আছেন রোনালদো, যেখানে তিনি গত চারটি মৌসুম কাটিয়েছেন ও গত মৌসুমে দুর্দান্ত পারফর্ম করে শিরোপা জিতিয়েছেন দলকে। ক্লাব ক্যারিয়ার কবে থামাবেন, সেটিও সুনির্দিষ্ট করে তিনি কিছু বলেননি সেভাবে।