সাপের ঝাঁপি থেকে স্কুলব্যাগ: পেশা বদলে নতুন স্বপ্নে বেদে সম্প্রদায়

শিবচর (মাদারীপুর) সবাদদাতা

সারাদেশ

‘আমরা এক ঘাটেতে রান্দি-বাড়ি, আরেক ঘাটেতে খাই—আমাদের সুখের সীমা নাই!’ বেদে সম্প্রদায়ের এই প্রচলিত গানের মতোই একসময় ছিল তাদের যাযাবর

2026-07-06T14:34:23+00:00
2026-07-06T14:34:23+00:00
  সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬,
২২ আষাঢ় ১৪৩৩
 
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সাপের ঝাঁপি থেকে স্কুলব্যাগ: পেশা বদলে নতুন স্বপ্নে বেদে সম্প্রদায়
শিবচর (মাদারীপুর) সবাদদাতা
সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ২:৩৪ পিএম 
ছবি ভোরের ডাক
‘আমরা এক ঘাটেতে রান্দি-বাড়ি, আরেক ঘাটেতে খাই—আমাদের সুখের সীমা নাই!’ বেদে সম্প্রদায়ের এই প্রচলিত গানের মতোই একসময় ছিল তাদের যাযাবর জীবন। তবে সময়ের পরিক্রমায় বদলে যাচ্ছে সেই চিরচেনা জীবনধারা। জলে ভাসমান জীবন ছেড়ে অনেকে এখন স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন ডাঙায়। সন্তানদের পাঠাচ্ছেন স্কুল ও মাদ্রাসায়। সাপ ধরা কিংবা সাপ খেলা দেখানোর পরিবর্তে বেদে যুবকদের বড় একটি অংশ এখন বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালাচ্ছেন, কেউ আইসক্রিম বিক্রি করছেন, আবার অনেকে রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন। এভাবেই বদলে যাচ্ছে তাদের পেশা, জীবনযাপন ও বসবাসের ধরন।

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর সংলগ্ন পাঁচ্চর-কাওড়াকান্দি পুরোনো (পরিত্যক্ত) সড়কের পাশে গত প্রায় ২০ বছর ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন বেদে সম্প্রদায়ের অন্তত অর্ধশত পরিবার। এসব পরিবারের সদস্যসংখ্যা প্রায় আড়াই শতাধিক। প্রথমদিকে ছোট ছোট খুপরি ঘরে বসবাস করলেও আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় অনেকেই এখন তুলনামূলক বড় ঘর নির্মাণ করেছেন। পরিবারের ছোট শিশুদের পাঠাচ্ছেন স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায়। তবে অধিকাংশ শিশুই প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে যেতে পারে না। অনেকেই অল্প বয়সেই জীবিকার তাগিদে কাজে নেমে পড়ে। তবুও যারা কিছুটা স্বচ্ছল হয়েছেন, তারা সন্তানদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন।

সরেজমিনে বেদেপল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, পুরুষেরা বিভিন্ন পেশায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। অন্যদিকে নারীরা ঘরের কাজ ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি অবসর সময়ে আড্ডায় মেতে উঠছেন। মাদবরেরচর ইউনিয়নের কাওড়াকান্দি-পাঁচ্চর পরিত্যক্ত সড়কের দুই পাশে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের পরই গড়ে উঠেছে বেদে সম্প্রদায়ের বসতি। ছোট খুপরি ঘরের পাশাপাশি মাঝারি ও তুলনামূলক বড় ঘরও তৈরি করেছেন অনেকে। সরকারি পরিত্যক্ত জায়গায় প্রায় দুই দশক ধরে বসবাস করছেন তারা।

বেদে সম্প্রদায়ের সদস্যরা জানান, তাদের পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর এলাকায়। একসময় তারা নৌকায় বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন এবং নদীর তীরেই বসবাস করতেন। কিন্তু শিবচরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর আধুনিক জীবনের সঙ্গে পরিচিত হন। দীর্ঘদিন এক স্থানে বসবাসের ফলে বদলে গেছে তাদের পৈতৃক পেশাও। স্থানীয় বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়ে অনেকেই আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ফলে তাবু বা খুপরি ঘরের পরিবর্তে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ঘরে বসবাস শুরু করেছেন অনেক পরিবার।

বেদে সম্প্রদায়ের সদস্য মো. হাসিবুল বলেন, শিবচরে প্রায় ২০ বছর ধরে বসবাস করছি। শুরুতে সরকারি রাস্তার পাশে তাবু করে থাকতাম। তখন পৈতৃক পেশার ওপরই নির্ভর ছিলাম। কিন্তু এখন মানুষ আগের মতো বিশ্বাস করে না, আয়-রোজগারও কমে গেছে। তাই অনেকেই পেশা বদলে ভ্যান চালাচ্ছেন, আইসক্রিম বিক্রি করছেন কিংবা রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন।

আরেক সদস্য দয়াল সরদার বলেন, দিন দিন নদীপথ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। নৌকায় করে সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব হয় না। নৌকা নিয়েই শিবচরে এসেছিলাম। এরপর আর ফিরে যাওয়া হয়নি। এখানে প্রায় ২০ বছর ধরে স্থায়ীভাবে আছি। অনেকেই ভোটার হয়েছেন, স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করেছেন। আমাদের সন্তানদেরও স্কুলে পাঠাচ্ছি। আগে লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না, এখন সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে শিশুরাও শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।

বেদে নারী কুলসুম বলেন, আগে গ্রামে গ্রামে ঘুরে সিঙ্গা লাগানো ও বাতের ব্যথার ওষুধ বিক্রি করতাম। এখন এসবের চাহিদা নেই। পুরুষেরা বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়েছেন। নারীদের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। আগের মতো আর সবাই গ্রামে ঘুরে বেড়ায় না।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এখানে ৪০ থেকে ৫০টি বেদে পরিবারের বসবাস। দীর্ঘদিন ধরে তারা এ এলাকায় থাকলেও নিজেদের সরদার প্রথা এখনও বজায় রেখেছেন। তবে জীবনযাত্রায় এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। পৈতৃক পেশার পরিবর্তে সাধারণ শ্রমনির্ভর বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়ে তারা গ্রামের অন্য সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন।

প্রতিদিন সকাল হলেই পরিবারের পুরুষেরা জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। শিশুরা যায় স্থানীয় মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পৈতৃক পেশা ছেড়ে নতুন কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের চেষ্টা করছেন বেদে যুবকেরা। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজের মূলধারার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন তারা।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: