চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলায় চলতি মৌসুমের সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়ম, ঘুষ আদায় ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ পেলেও খাদ্য গুদামে ধান জমা দিতে প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে অনেক প্রকৃত কৃষক সব কাগজপত্র থাকার পরও ধান বিক্রির সুযোগ পাননি।
ভুক্তভোগী কৃষক ফারুক আহমদ বলেন, তিনি কৃষি কার্ডধারী এবং উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রত্যয়নপত্রও নিয়েছেন। খাদ্য গুদাম থেকে বস্তাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সব শর্ত পূরণ করার পরও তার ধান গ্রহণ করা হয়নি। একই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন তার ভাই মহসিনও।
ফারুকের অভিযোগ, যারা ধান দিতে পেরেছেন তাদের কাছ থেকে বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা করে নেওয়া হয়েছে। তিনি নিজেও অতিরিক্ত টাকা দিতে রাজি হওয়ার কথা জানালেও কয়েকদিন ঘোরানোর পর তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়, এ বছর আর ধান নেওয়া হবে না।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক কৃষক জানান, খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি করতে তাকে ‘অফিস খরচ’ নামে ৭ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তার দাবি, অন্য অনেক কৃষকের কাছ থেকেও একইভাবে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে।
কৃষক মোজাম্মেল সরকার বলেন, সরকারি ভ্যাট, বস্তা ও শ্রমিক খরচের কথা বলে প্রতি বস্তায় ১০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। তিনি ৬৫ বস্তা ধান সরবরাহ করেছেন এবং এ বাবদ তার কাছ থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করা হয়েছে।
একাধিক কৃষকের অভিযোগ, খাদ্য গুদামের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্ধারিত ব্যক্তিদের ধান সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হলেও প্রকৃত অনেক কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে তারা বাধ্য হয়ে কম দামে খোলা বাজারে ধান বিক্রি করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চৈতন্য পাল বলেন, চলতি মৌসুমে প্রায় ২৫০ জন কৃষককে কৃষি অফিস থেকে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। প্রত্যয়নপত্রধারী কৃষকদের ধান পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে খাদ্য গুদাম কর্তৃপক্ষ ক্রয় করবে। কৃষি অফিসের প্রত্যয়ন ছাড়া ধান সরবরাহের সুযোগ নেই।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক খালেদা আক্তার জানান, ৭৫ মণ ধান বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত ভ্যাট বাবদ ৫৪০ টাকা ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অর্থ নেওয়ার বিধান নেই। অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মতলব দক্ষিণ খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-এলএসডি) একরামুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি দরে ৩০০ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভ্যাট ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সুযোগ নেই। কোনো কর্মচারী অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকলে সে বিষয়ে তার জানা নেই। লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম আহমেদ বলেন, কৃষি অফিসের প্রত্যয়নের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুর রহমান খান বলেন, অভিযোগ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চলতি মৌসুমে মতলব দক্ষিণ উপজেলায় সরকারি সংগ্রহ কর্মসূচির আওতায় ৩৬ টাকা কেজি দরে মোট ৩০০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অনিয়মের অভিযোগে পুরো কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।