সকালে নদীর ঘাটে ভেসে ওঠা অজ্ঞাত এক মরদেহ, দুপুরে ফসলের ক্ষেত থেকে উদ্ধার আরেকটি লাশ, সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি বাসা থেকে অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর, এ যেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় প্রতিদিনের বাস্তবতা।
সংবাদমাধ্যম খুললেই কোথাও না কোথাও মরদেহ উদ্ধারের খবর। এসব ঘটনার পেছনে কখনও হত্যা, কখনও আত্মহত্যা, কখনও দুর্ঘটনা, আবার কখনও স্বাভাবিক মৃত্যুর পর লাশ উদ্ধারের ঘটনা থাকলেও ধারাবাহিক এমন সংবাদ সাধারণ মানুষের মনে বাড়িয়ে তুলছে অজানা আতঙ্ক। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জননিরাপত্তা এবং তদন্ত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানী ঢাকা, রংপুর, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, জামালপুর, রাজশাহী, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নারী, পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। কোনোটি নদী থেকে, কোনোটি রেললাইন বা সড়কের পাশ থেকে, আবার কোনোটি বাসা কিংবা নির্জন স্থান থেকে উদ্ধার হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
বিশেষ করে রংপুরে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার পর এক শিশু শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার এবং পরে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার অভিযোগ দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। স্থানীয়রা বলছেন, এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি জনমনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজধানীতেও একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি সবুজবাগে এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর মরদেহ বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অস্বাভাবিক মৃত্যু, আত্মহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিয়মিতই মরদেহ উদ্ধার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রতিটি ঘটনায় আলাদা তদন্ত চললেও ধারাবাহিক এসব খবর নগরবাসীর মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করছে।
অন্যদিকে টুরাগ নদী থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও সাতটি মরদেহ উদ্ধারের দাবি করা হলেও পুলিশ জানায়, এমন তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পৃথক ঘটনায় তিনটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে এবং এগুলোর সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত রাজনৈতিক দাবির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
জামালপুরে যমুনা নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হওয়া দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। যদিও এটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু, তবুও ধারাবাহিক মরদেহ উদ্ধারের সংবাদ মানুষের মনে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ধরনের মৃত্যুর ঘটনাকে একই দৃষ্টিতে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু প্রতিদিন এমন খবর প্রকাশিত হওয়ায় মানুষের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
১৭ মাসে নদ-নদী থেকে উদ্ধার ৭৪৯ মরদেহ : নদীপথে পরিস্থিতিও কম উদ্বেগজনক নয়। নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত গত ১৭ মাসে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে মোট ৭৪৯টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। জাতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও এই তথ্য উঠে এসেছে। সংখ্যাটি শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের নদীপথে নিরাপত্তা, অপরাধ ও দুর্ঘটনা—সবকিছুর একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
নৌ পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে ডুবে মৃত্যু, দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা এবং হত্যার শিকার, সব ধরনের ঘটনাই রয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মরদেহ দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তদন্তও দীর্ঘায়িত হয়। অনেক ঘটনায় প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হলেও কিছু ঘটনা এখনও রহস্যাবৃত রয়ে গেছে।
শুধু ২০২৬ সালের ১৫ থেকে ২১ মে, এই এক সপ্তাহেই দেশের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে ১৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় হত্যা ও অপমৃত্যুসহ একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীপথে নিয়মিত টহল, সিসিটিভি নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা গেলে অনেক ঘটনার রহস্য দ্রুত উদ্ঘাটন সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নৌ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাইল করিম বলেন, প্রতিটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় প্রথমেই তারা এটি হত্যা নাকি অপমৃত্যু, তা নির্ধারণের চেষ্টা করেন। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যালোচনার মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হয়।
তার ভাষ্য, যদি আলামত ও ময়নাতদন্তে হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সেটিকে হত্যা মামলা হিসেবে রুজু করা হয়। অন্যদিকে দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা বা অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হলে অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে তদন্ত চালানো হয়। তবে প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে নৌ পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলেও তিনি জানান।
এমতাবস্তায় অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্যের দ্রুত বিস্তার। অনেক সময় একটি ঘটনার সঙ্গে অন্য ঘটনার যোগসূত্র তৈরি করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে তোলে।
তাদের মতে, উদ্ধার হওয়া সব মরদেহ হত্যার শিকার নয়। এর মধ্যে রয়েছে আত্মহত্যা, পানিতে ডুবে মৃত্যু, দুর্ঘটনা, অসুস্থতায় মৃত্যু এবং স্বাভাবিক মৃত্যুর পর লাশ উদ্ধারের ঘটনাও। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ঘটনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সিআইডি, পিবিআই ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, ডিজিটাল তথ্য ও ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পারিবারিক কলহ, মাদকাসক্তি, সামাজিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, মানসিক অবসাদ এবং অপরাধপ্রবণতা, সবকিছু মিলিয়েই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা বাড়তে পারে। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলেই হবে না; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং সমাজের সব অংশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, প্রতিটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ঘটনা যেন ধামাচাপা না পড়ে এবং অপরাধীরা দ্রুত বিচারের আওতায় আসে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের অভিযোগ দ্রুত আমলে নেওয়া এবং মরদেহের পরিচয় শনাক্তে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
এদিকে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নিখোঁজের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে, মরদেহ উদ্ধারের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত পরিচয় শনাক্ত করে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা হবে এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
উল্লেখ্য, দেশজুড়ে একের পর এক মরদেহ উদ্ধারের খবর নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ এক নয়, কোথাও হত্যা, কোথাও দুর্ঘটনা, কোথাও আত্মহত্যা, আবার কোথাও অপমৃত্যু। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়িত্বশীল তথ্য প্রচার।
একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি, নদীপথে নজরদারি জোরদার, সামাজিক সচেতনতা এবং গুজব প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগই জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।