আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে ২০১২ সালে নিখোঁজ হওয়া পিরোজপুরের সুখরঞ্জন বালীকে গুমের অভিযোগে এক সহকারী পুলিশ সুপারকে (এএসপি) গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এএসপি ফজলুর রহমানকে বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে রাজধানীতে তাঁর বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তাকে আটক করা হয়েছে।
সুখরঞ্জন বালী ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। তবে শুরু থেকেই তাঁর পরিবার এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অভিযোগ করে আসছিল, ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর কার্যালয়ে সুখরঞ্জন বালী একটি অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৩২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়।
অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক বিচারক এ টি এম ফজলে কবির, সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়ালের নামও রয়েছে।
সুখরঞ্জন বালীর অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১০ সালে ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন তাকে ১৯৭১ সালে তাঁর ভাই বিশা বালীর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে চাপ দেন। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরবর্তীতে সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদীর অনুরোধে প্রকৃত ঘটনা আদালতে তুলে ধরতে তিনি সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে সম্মত হন।
অভিযোগে সুখরঞ্জন দাবি করেন, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে পৌঁছানোর পর পুলিশ তাঁর চোখ ও হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে প্রায় চার মাস বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।
পরে তাঁকে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে গিয়ে বিজিবির মাধ্যমে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনার স্বরূপনগর থানার বৈকারী এলাকায় পাঠানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাকে আটক করে দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠায়।
সুখরঞ্জনের ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকাকালে আন্তর্জাতিক কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্যাতনের অভিযোগ নথিভুক্ত করেন। দেশে ফেরার পরও নিরাপত্তার আশঙ্কায় তিনি নিজ জেলা পিরোজপুরে ফিরতে পারেননি এবং আত্মগোপনে রয়েছেন।
এদিকে, এএসপি ফজলুর রহমানের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দীর্ঘদিন আলোচিত এই গুমের ঘটনায় তদন্তে নতুন অগ্রগতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।