বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন শুধু মৌসুমি দুর্যোগ নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রভাবগুলোর একটি। আবহাওয়াবি ও গবেষকদের মতে, গত এক দশকে দেশের তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা এবং বায়ুমণ্ডলের অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। এর ফলে বজ্রমেঘ দ্রুত তৈরি হচ্ছে এবং বজ্রপাতের ঘটনাও বাড়ছে। বিশেষ করে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়ে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং বজ্রঝড়ের প্রকৃতি বদলে যাওয়ায় দেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি আগের তুলনায় বেড়েছে বলে মনে করছেন গবেষকরা। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘনত্ব বাংলাদেশে অন্যতম বেশি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বজ্রপাতে মারা যান ২২৬ জন। এরপর ২০১৬ সালে ৩৯১ জন (২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়), ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪২৭ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ২৪৩ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরের গত ৬ মাসে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১৪০ জন, যা গড়ে ৩২২ জন।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) গবেষণাতেও দেখা গেছে, বজ্রপাতে মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটনাই গ্রামীণ এলাকায় ঘটে। নিহতদের বড় অংশ কৃষিকাজ বা মাছ ধরার সময় খোলা জায়গায় ছিলেন। অনেকেই বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে আশ্রয় নিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সম্প্রতি সংসদে জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যমান জাতীয় নীতিমালা আধুনিকায়ন এবং বজ্রাঘাতে প্রাণহানি কমাতে মাঠপর্যায়ে নানামুখী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে সরকার। দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় প্রাণহানি কমানোর বিষয়ে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বজ্রপাতের ঝুঁকি হ্রাস ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের ‘বজ্রনিরোধক দণ্ড বা লাইটিং অ্যারেস্টার’ লাগবে। তবে সেটাই একমাত্র উপায় নয়। আমরা বিশেষ করে হাওরাঞ্চলসহ বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণেরও পরিকল্পনা করছি। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্যানুযায়ী, দেশে বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় বজ্রপাতের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, যা প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত ঘটে।
গত মাসের মে ও জুন মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রপাতে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়। অথচ জেলার বিভিন্ন স্থানে কয়েক বছর আগেই বসানো হয় বজ্রনিরোধক যন্ত্র বা লাইটনিং অ্যারেস্টার। এসব মানুষের মৃত্যু প্রমাণ করে অ্যারেস্টারগুলো ভালো কাজ করছে না।
এ বিষয়ে বুয়েটের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রাফি উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে বজ্রনিরোধক অ্যারেস্টার দিয়ে বজ্রপাত নিরোধ অবাস্তব ধারণা, কোথাও এটা হয়নি। বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে এই দণ্ডগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল থেকে প্রশ্ন ওঠার পর অন্তর্বর্তী সরকার আমলে এগুলো আর নতুন করে স্থাপন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখন আবার আলোচনায় এসেছে। আগেরগুলো নিয়ে মূল্যায়ন হওয়া উচিত বলেও তিনি মনে করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ২০২১-২২ অর্থবছরে এ জন্য সাড়ে ১৯ কোটি টাকা দেশের ১৫ জেলার ১৩৫ উপজেলায় মোট ৩৩৫টি বজ্রনিরোধক দণ্ড ও বজ্রপাত নিরোধক যন্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল, উন্মুক্ত মাঠ, কৃষি এলাকা এবং বজ্রপাতপ্রবণ জেলাগুলোতে এসব দণ্ড স্থাপন করা হয়। তবে এই দণ্ডগুলোর অধিকাংশই কয়েক বছরের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের কয়েক বছর পরও কোনো জাতীয় মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়নি। প্রচলিত বজ্রনিরোধক দণ্ড ২০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করলে এর কার্যকর সুরক্ষা ব্যাসার্ধ প্রায় ২৯ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে আধুনিক আর্লি স্ট্রিমার ইমিশন (ইএসই) প্রযুক্তির বজ্রনিরোধক ৬০ মিটার উচ্চতায় স্থাপন করা হলে সর্বোচ্চ প্রায় ১২০ মিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়ার দাবি করা হলেও বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যারেস্টার বসানো হয়েছে মানেই আশপাশে আর বজ্রপাত হবে না—এই ভুল ধারণা মানুষকে উল্টো ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এক সভার নোটিশে দেখা যায়, ৮ জুন মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হয়েছে, যেখানে বজ্র নিরোধক দণ্ড সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও ছিল। সেই বৈঠকে সরকার নতুন করে বজ্রনিরোধক প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত থেকে প্রাণহানি কমাতে শুধু অ্যারেস্টার বসালেই হবে না। এর সঙ্গে প্রয়োজন আধুনিক বজ্রপাত পূর্বাভাস ব্যবস্থা, মোবাইলে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা, কৃষকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, মাঠে কাজের সময়সূচি পরিবর্তন, বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা, বজ্রপাতের সময় কী করতে হবে এসব বিষয়ে গণপ্রচার চালানো।
দুর্যোগবিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, অ্যারেস্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনে খরচ বাড়বে, কিন্তু মানুষের জীবন বাঁচবে—তার নিশ্চয়তা নেই। মাঠে কাজ করা মানুষ তো বুঝতেই পারে না কখন বজ্রপাত হবে। সে সম্পর্কে তার সচেতনতা ও ধারণা থাকা প্রয়োজন।
সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) সাধারণ সম্পাদক রশিদ মোল্লা বলেন, প্রযুক্তি থাকলেও সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে সময়মতো সতর্কবার্তা পৌঁছায় না। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘও বেশ উদ্যোগী। জাতিসংঘের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে সবাইকে সতর্কবার্তার আওতায় আনা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবি ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ‘দেশে বজ্রপাত সারা বছরই কমবেশি হয়। তবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোট বজ্রপাতের প্রায় ৩৮ শতাংশ এই সময়ে ঘটে। অন্যদিকে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ঘটে প্রায় ৫১ শতাংশ বজ্রপাত। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে এ হার প্রায় আট শতাংশ এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে প্রায় দুই-তিন শতাংশ।
তিনি বলেন, সংখ্যায় কম হলেও মার্চ থেকে মে সময়ের বজ্রপাত তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী ও প্রাণঘাতী হয়ে থাকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের (ডিডিএম) তথ্য ও বৈশ্বিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে গড়ে ৮২ দশমিক ৪৪টি বজ্রপাত ঘটে। বিশ্বের কিছু দেশে বজ্রপাতের ঘনত্ব আরও বেশি হলেও উন্নত অবকাঠামো, কার্যকর আগাম সতর্কতা ও নিরাপদ আশ্রয়ব্যবস্থার কারণে প্রাণহানি তুলনামূলক কম।
তিনি আরও বলেন, রাইমসের কারিগরি সহায়তায় আবহাওয়া অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাতের সতর্কবার্তা প্রচার শুরু করেছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে এক থেকে ছয় ঘণ্টা আগে বজ্রপাতের সতর্কবার্তা ও করণীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে।