দেশীয় পুষ্টিকর স্বাদুপানির অণুশৈবাল ব্যবহার করে দেশে প্রথমবারের মতো স্বল্পব্যয়ী, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই সমন্বিত লাইভ ফিড-অ্যাকোয়াফিড উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. সালেহা খান এবং তাঁর গবেষক দল। গবেষকদের আশা, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মৎস্যচাষে ব্যয়বহুল প্রোটিন উৎস ফিশমিলের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি (বিএএস) ও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) অর্থায়নে পরিচালিত তিন বছর মেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের সমাপনী সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রকল্পের প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. সালেহা খান।
তিনি জানান, দেশের মিঠাপানির মৎস্যচাষে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মাছের লার্ভা ও পোনার জন্য মানসম্পন্ন জীবন্ত খাদ্য এবং সাশ্রয়ী জলজ খাদ্যের অভাব। এই সমস্যা সমাধানে দেশীয় অণুশৈবাল ব্যবহার করে টেকসই ও স্বল্পব্যয়ী লাইভ ফিড এবং অ্যাকোয়াফিড উৎপাদন প্রযুক্তি উন্নয়নের লক্ষ্যে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত ব্যয়বহুল প্রোটিন উৎস, বিশেষ করে ফিশমিলের ওপর নির্ভরতা কমানোর কার্যকর বিকল্প তৈরি করা। এ লক্ষ্যে দেশে প্রথমবারের মতো সমন্বিত এ প্রযুক্তি সফলভাবে উদ্ভাবন করা হয়েছে।
অধ্যাপক ড. সালেহা খান জানান, গবেষণাটি চারটি ধারাবাহিক পর্যায়ে সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে দেশীয় সিন্ডেস্মাস প্রজাতির অণুশৈবাল সফলভাবে পৃথক (আইসোলেশন) করে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য জৈব উপাদান ব্যবহার করে স্বল্পব্যয়ী ব্যাপক উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে উৎপাদিত অণুশৈবাল ব্যবহার করে মাছের লার্ভার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জীবন্ত খাদ্য জুপ্ল্যাঙ্কটনের উৎপাদন ও পুষ্টিমান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়।
তাঁর ভাষ্য, তৃতীয় পর্যায়ে পুষ্টিবর্ধিত লাইভ ফিড ব্যবহার করে মাছের রেণু ও পোনা প্রতিপালনে অধিক বৃদ্ধি, বেশি বেঁচে থাকার হার এবং উন্নত গুণগত মান অর্জিত হয়। সর্বশেষ পর্যায়ে উৎপাদিত মাইক্রোঅ্যালগাল বায়োমাস অ্যাকোয়াফিডে অন্তর্ভুক্ত করে ফিশমিলের আংশিক বিকল্প হিসেবে সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অধিক টেকসই অ্যাকোয়াফিড প্রযুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং ব্যয়বহুল প্রোটিন উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি কার্যকর পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
গবেষণার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক ড. সালেহা খান বলেন, এই গবেষণার সবচেয়ে বড় নতুনত্ব শুধু মাইক্রোঅ্যালজি উৎপাদনে নয়; বরং একটি একক গবেষণা কাঠামোর আওতায় দেশীয় মাইক্রোঅ্যালজি পৃথকীকরণ, স্বল্প খরচে ব্যাপক চাষ, জীবন্ত খাদ্য উৎপাদন, লার্ভা প্রতিপালন এবং ফিশমিলের টেকসই বিকল্প উদ্ভাবনকে সমন্বিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ মিঠাপানির মৎস্যচাষ উৎপাদন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই মৎস্যচাষ সম্প্রসারণ, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, হ্যাচারির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প জলজ খাদ্য উৎপাদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সমাপনী সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আলী রেজা ফারুক। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আল ইমরান। এ সময় অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, পিএইচডি ফেলো এবং এমএস শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।