সারা দেশের ১২ লাখ ৬৭ হাজার শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। পরীক্ষাকে সুষ্ঠু, নকলমুক্ত ও নির্বিঘ্ন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা বোর্ডগুলো একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে। নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রে উপস্থিতি, প্রবেশপত্র ও নিবন্ধনপত্র সঙ্গে রাখা এবং নিষিদ্ধ সামগ্রী বহন না করাসহ এসব নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পাঁচ বছর পর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে হতে যাচ্ছে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এতে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সারা দেশে পরীক্ষা নেয়া হবে অভিন্ন প্রশ্নে।
নকল অনিয়ম ঠেকাতে সব পরীক্ষা কেন্দ্রে থাকছে সিসিটিভি ক্যামেরা। বডি ক্যাম্পসহ মোতায়ন থাকবে পুলিশ। কেন্দ্রগুলোতে সম্পন্ন হয়েছে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি।
কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, বডি ক্যাম্প থাকলে আসলে কোন ধরনের সমস্যা হতে পারে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে, তো এর আগে আমাদের এ ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা নাই। ফলে আসলেই এটা শিক্ষার্থী হিসেবে একটু অস্বস্তির আরকি। আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করছি অতিরিক্ত সহজ কিংবা হচ্ছে অতিরিক্ত কঠিন কোনো প্রশ্ন হবে না। একটি সুন্দর একটি সাবলীল প্রশ্ন হবে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মান ও ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, একই ধরনের প্রশ্ন হয়েছে এটা ভালো উদ্যোগ। ঠিক আছে? কিন্তু শহরের ম্যাক্সিমাম স্কুল কলেজে যে ফ্যাসিলিটিগুলো আছে যে মাপের প্রশ্ন করা হয় এই একই ধরনের স্ট্যান্ডার্ডের প্রশ্ন যদি করা হয় অন্যান্য জায়গায় তাদের কি সেই ল্যাব আছে? তাদের কি সেই শিক্ষক ওই মানের ছিল? ওইটা কি তাদের পড়ানো হয়েছে? ওই টেস্টটা কি তাদের করানো হয়েছে? এখন এই জায়গাগুলো কিন্তু খেয়াল রাখা লাগবে যে প্রশ্ন করার আগে অর্থাৎ কেউ যাতে বঞ্চিত না হয়।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি জানান, কোনো এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা গ্রহণ সমস্যা হলে সেদিন সারা দেশের পরীক্ষাই স্থগিত করা হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, একটা ব্যক্তি কোনো কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ঘটিয়ে সে সময়মতো কেন্দ্রে যেতে পারেনি। সেটা লোকাল প্রশাসন যদি ইচ্ছা করে এবং যদি যৌক্তিক মনে করে তাহলে তাকে একটু স্পেস দিয়ে পরীক্ষাটা নিতে পারে। কোনো একটা বিভাগে বড় ধরনের ডিজাস্টার আসলে টোটাল পরীক্ষাটাকে পোস্টপন্ড করে এনাদার একটা ডেতে আবার সারা দেশে পরীক্ষার আয়োজন করা। এটাকে আমরা বেটার মনে করছি।
পরীক্ষার্থী ১২ লাখ ৬৭ হাজার, কোন বোর্ডে কত?
এ বছর নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছেন ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৬ জন পরীক্ষার্থী। সারা দেশের দুই হাজার ৬৯৭টি পরীক্ষা কেন্দ্রে তারা পরীক্ষায় অংশ নেবেন।
বোর্ডভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ঢাকা বোর্ডে। এ বোর্ডে ৩১০টি কেন্দ্রে এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন তিন লাখ ৩৯৩ জন। রাজশাহী বোর্ডে ২০৮টি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী এক লাখ ৪০ হাজার ৮৩০ জন, দিনাজপুরে ২১২টি কেন্দ্রে এক লাখ ১৩ হাজার ৪৭৯ জন, যশোর বোর্ডে ২৪০টি পরীক্ষা কেন্দ্রে এক লাখ ১৭ হাজার ২১০ জন।
চট্টগ্রামের ১১৪টি কেন্দ্রে এবার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন, সিলেটের ৯৬টি কেন্দ্রে ৭১ হাজার ৭১১ জন, কুমিল্লার ১৯৩টি কেন্দ্রে ৯৪ হাজার ৮০২ জন, ময়মনসিংহের ১১১টি কেন্দ্রে ৭৩ হাজার ৩৭ জন এবং বরিশালের ১৪২টি পরীক্ষা কেন্দ্রে ৫৮ হাজার ৬৬৪ জন পরীক্ষার্থী রয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এ বছর সারা দেশে ৪৬১টি পরীক্ষা কেন্দ্রে মোট ৯২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেবেন। আর কারিগরি বোর্ডের অধীনে ৬১০টি কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাখ সাত হাজার ৯৬৪ জন।
নকল-অনিয়ম ঠেকাতে কড়াকড়ি : এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে কেন্দ্র পরিচালনা, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, পরীক্ষার্থী প্রবেশ, কক্ষ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ডিজিটাল নজরদারিসহ সব বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।
নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি পরীক্ষার কক্ষে প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য একজন করে কক্ষ পরিদর্শক থাকবে। কোনো কক্ষে দুজনের কম দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। বসার ক্ষেত্রেও নির্ধারণ করা হয়েছে নির্দিষ্ট মানদণ্ড। ৫ বাই ৬ ফুট দীর্ঘ বেঞ্চে দুজন এবং ৪ ফুট বেঞ্চে একজন পরীক্ষার্থী বসতে পারবেন।
পরীক্ষার্থীরা সকাল সাড়ে ৮টা থেকে কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করতে পারবেন। তবে পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে সবাইকে নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে দেরিতে আসা শিক্ষার্থীদের তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া যাবে।
প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনাতেও রাখা হয়েছে একাধিক নিরাপত্তা স্তর। পরীক্ষা শুরুর তিনদিন আগে ট্রেজারি বা থানা লকারে সংরক্ষিত প্রশ্নপত্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে যাচাই করতে হবে।
পরীক্ষার দিন নির্ধারিত প্রশ্নপত্র ট্যাগ অফিসার ও পুলিশের প্রহরায় কেন্দ্রে আনা হবে এবং মোবাইলের মাধ্যমে নির্ধারিত সেট কোড পাওয়ার পরই প্রশ্নপত্র খোলা যাবে। নির্ধারিত সেটের বাইরে পরীক্ষা নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক : পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিও এবার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা চালু রাখতে হবে এবং ক্যামেরার আইডি, পাসওয়ার্ড, ব্র্যান্ড, ডিভাইস সিরিয়াল নম্বর ও ডিভিআর/এনভিআর সংযোগের তথ্য শিক্ষা বোর্ডে জমা দিতে বলা হয়েছে।
সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করে কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো কেন্দ্রে সিসিটিভি অকার্যকর থাকলে বা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শৈথিল্য ধরা পড়লে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন না। পরীক্ষার্থীরাও কাঁটাযুক্ত ঘড়ি ছাড়া অন্য কোনো ডিভাইস বহন করতে পারবে না।
পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রে অপ্রয়োজনীয় উপস্থিতি বন্ধ রাখা, টয়লেট তল্লাশি, প্রশ্ন ও উত্তরপত্র পরিবহনে পুলিশের সম্পৃক্ততা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র আলাদাভাবে সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কন্ট্রোল রুম চালু : এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে সার্বিক সমন্বয় ও জরুরি যোগাযোগের জন্য ঢাকা শিক্ষা বোর্ড বিশেষ কন্ট্রোল রুম চালু করেছে। কন্ট্রোল রুমের টেলিফোন নম্বর- ০২-২২৩৩৬৯৮১৫।
এছাড়া যোগাযোগের জন্য ০১৫৫০৪১১২০৩, ০১৭১৪৯৯৪০৭৩ ও ০১৭৫6১০৩১৫২ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। ই–মেইল ঠিকানা: [email protected]।