দীর্ঘ ১৫ বছরের গবেষণার পর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরা নতুন একটি রঙিন মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছেন। গবেষকদের দাবি, উন্নত স্বাদ, অধিক ওজন, নিরাপদ মাংস উৎপাদন এবং খামারিদের লাভজনকতা বিবেচনায় জাতটি দেশের পোলট্রি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণাটির চূড়ান্ত ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণা প্রকল্পটির নেতৃত্ব দেন পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যা। তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) অর্থায়নে দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন প্যারেন্ট লাইন সংরক্ষণ, নির্বাচন ও সংকরায়ণের মাধ্যমে নতুন জাতটি উন্নয়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গবেষণায় সেক্স-লিংক হোয়াইট লাইনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর হোমোজাইগোসিটি ৮৯ থেকে ৯৩ দশমিক ১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা বাণিজ্যিকভাবে স্থায়ী জাত হিসেবে উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি মুরগির পালকের রঙ নির্ধারণকারী এসওএক্স-১০ জিনের ডিলিশন শনাক্তে একটি সহজ পিসিআর পদ্ধতিও উদ্ভাবন করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন জাতের কিছু প্যারেন্ট লাইন ৬২ সপ্তাহে প্রায় ২০৫টি পর্যন্ত ডিম উৎপাদনে সক্ষম। এছাড়া একদিন বয়সী বাচ্চার গড় ওজন প্রচলিত সোনালি মুরগির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা পরবর্তীতে বাজারজাতের সময় চূড়ান্ত ওজন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং খামারিদের অতিরিক্ত মুনাফা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে গবেষকরা সরাসরি গ্রামে গিয়ে নারী খামারিদের ক্লাস্টারভিত্তিক হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন। নিয়মিত কারিগরি সহায়তা, টিকাদান ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করায় এসব খামারে মুরগির বৃদ্ধি, খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা এবং উৎপাদনশীলতা বেড়েছে, একই সঙ্গে মৃত্যুহারও কমেছে। বাজারে ভালো চাহিদার কারণে অনেক খামারি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি দিন মুরগি পালন করে প্রতি কেজি ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করছেন।
ড. বজলুর রহমান মোল্যা জানান, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণে এই মুরগির মাংসে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, দেশি মুরগির নামে বাজারজাত নয়, বরং উন্নত স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও নিরাপদ মাংসের নিশ্চয়তা দিয়ে এটিকে একটি স্বতন্ত্র রঙিন মাংসের ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তাদের লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, গবেষণার সুফল ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ না রেখে খামারিদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। এতে নিরাপদ প্রাণিজ প্রোটিন উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি খামারিরাও আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ অনুষদের বিক্রয় কেন্দ্র দ্রুত চালুর নির্দেশও দেন, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উৎপাদিত দুগ্ধ, মাংস ও পোলট্রিজাত পণ্য সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।
অনুষ্ঠান শেষে নতুন উদ্ভাবিত মুরগির মাংস দিয়ে প্রস্তুত বিভিন্ন খাবার অতিথিদের পরিবেশন করা হয়।