ধরা পড়ে খুচরা কারবারি; আড়ালে গডফাদার

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

মধ্যদুপুর। রাজধানীর একটি ব্যস্ত থানার কয়েকশ গজ দূরের বস্তির সরু গলিতে ঢুকতেই ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন, ‘কী লাগবে, ইয়াবা নাকি গাঁজা?’ কয়েক

2026-06-28T15:11:51+00:00
2026-06-28T15:11:51+00:00
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
অদৃশ্য সিন্ডিকেটে অটুট সাম্রাজ্য
ধরা পড়ে খুচরা কারবারি; আড়ালে গডফাদার
শাকিল আহমেদ
রোববার, ২৮ জুন, ২০২৬, ৩:১১ পিএম 
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
মধ্যদুপুর। রাজধানীর একটি ব্যস্ত থানার কয়েকশ গজ দূরের বস্তির সরু গলিতে ঢুকতেই ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন, ‘কী লাগবে, ইয়াবা নাকি গাঁজা?’ কয়েক মিনিটের মধ্যেই হাতবদল হয় মাদক। আশপাশে মানুষের চলাচল, দোকানপাট, শিশুদের খেলাধুলা, সবকিছুই যেন স্বাভাবিক। অথচ এই স্বাভাবিকতার আড়ালেই চলছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য। প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হয়, শত শত গ্রেপ্তারও হয়। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও সচল হয়ে ওঠে একই স্পট। প্রশ্ন একটাই, তাহলে ধরা পড়ে কারা, আর কারা থেকে যায় আড়ালে?

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষায়, মাদকবিরোধী অভিযানে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ে খুচরা বিক্রেতা, বাহক কিংবা পরিবহনকারী। অথচ সীমান্ত থেকে শহর পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা, অর্থায়ন ও নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে, সেই গডফাদারদের বড় অংশই আইনের নাগালের বাইরে থেকে যায়। ফলে প্রতিটি অভিযান সাময়িক সফলতা আনলেও অটুট থাকে মাদকের মূল নেটওয়ার্ক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকা মহানগরীতেই বর্তমানে ৬ শতাধিক সক্রিয় মাদক স্পট রয়েছে। এসব স্পটে প্রায় ২০ হাজার ব্যক্তি সরাসরি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের পেছনে রয়েছে প্রায় দেড় হাজার প্রভাবশালী ব্যক্তি, অর্থদাতা ও সন্ত্রাসী, যারা পুরো চক্রকে নিরাপত্তা, অর্থ এবং প্রভাবের ছত্রছায়ায় পরিচালনা করছে।

বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, কামরাঙ্গীরচর, তেজগাঁও, ডেমরা, বাড্ডা, রামপুরা, উত্তরা, টঙ্গীসংলগ্ন এলাকা এবং নগরীর বিভিন্ন বস্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাদকের বড় বড় বাজার। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অনেক এলাকায় দিনের আলোতেই মাদক কেনাবেচা হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে হুমকি, হামলা কিংবা মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো হয়। ফলে নীরবতাই হয়ে উঠেছে আত্মরক্ষার একমাত্র উপায়।

রাজধানীর বাইরেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। সীমান্তবর্তী জেলা, নদীপথ, উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু করে ছোট শহর ও গ্রাম- সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে মাদকের বিস্তার। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিলের পাশাপাশি এখন দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এলএসডি, এমডিএমএ ও কেটামিনের মতো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিনথেটিক মাদক।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা বলছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। তাদের বড় অংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছর। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও সম্ভাবনাময় জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ধীরে ধীরে নেশার ভয়ংকর ফাঁদে আটকে পড়ছে।

গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৬১ শতাংশ আসক্ত গাঁজা ও ইয়াবা ব্যবহার করেন। তবে উদ্বেগজনকভাবে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে সিনথেটিক মাদকের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, এসব মাদক মানুষের মস্তিষ্কে দ্রুত প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘমেয়াদে মানসিক রোগ, সহিংসতা, আত্মহত্যাপ্রবণতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।

মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার পরিসংখ্যানও কম নয়। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে মাদক-সংক্রান্ত ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৪৩৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। শুধু ডিএনসিই করেছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৬২টি মামলা, যেখানে আসামির সংখ্যা ১ লাখ ৩৩ হাজার ১৭৪ জন।

একই সময়ে উদ্ধার হয়েছে ২০ কোটি ৮৩ লাখের বেশি ইয়াবা, প্রায় ২ হাজার ১৫০ কেজি হেরোইন, ১৬৩ কেজির বেশি কোকেন, ৫ লাখ ২৪ হাজার কেজির বেশি গাঁজা, ২৬ লাখের বেশি বোতল ফেনসিডিল এবং বিপুল পরিমাণ আইস, এলএসডি, কেটামিনসহ অন্যান্য মাদক। তবে প্রশ্ন হলো, এত মামলা, এত গ্রেপ্তার এবং এত মাদক উদ্ধারের পরও কেন থামছে না এই অবৈধ বাণিজ্য?

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, অভিযানের বড় অংশই সীমাবদ্ধ থাকে মাঠপর্যায়ের কারবারিদের মধ্যে। কিন্তু যারা সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ করায়, বড় চালান নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থায়ন করে কিংবা প্রভাব খাটিয়ে পুরো ব্যবসা সচল রাখে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অনেক বেশি কঠিন। ফলে প্রতিবারই ভাঙে খুচরা নেটওয়ার্ক, অক্ষত থাকে মূল কাঠামো।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদক ব্যবসা এখন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত থেকে পাইকারি সরবরাহ, পরিবহন, গুদামজাত, খুচরা বিক্রি এবং অর্থ পাচার—প্রতিটি ধাপে রয়েছে আলাদা সিন্ডিকেট। এই বহুমাত্রিক নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে শুধু গ্রেপ্তার বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।

চলতি বছরের ১ মে থেকে শুরু হওয়া বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযানে এক মাসেই ৯ হাজার ৪৩ জন কারবারি গ্রেপ্তার এবং ৬ হাজার ৪৩৪টি মামলা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও ফেনসিডিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অভিযান তখনই কার্যকর হবে, যখন এর ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং মূল অর্থদাতাদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে।

এদিকে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অনলাইনভিত্তিক মাদক বাণিজ্য। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ এবং ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহার করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে সিনথেটিক মাদক। ফলে প্রচলিত নজরদারির বাইরে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের অপরাধচক্র, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।

ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্ত, সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর ও বিমানবন্দরে আধুনিক স্ক্যানার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, উন্নত ফরেনসিক সক্ষমতা এবং অনলাইন আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার না করলে এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিচ্ছেন তারা।

ডিএনসির উপপরিচালক (অপারেশনস) মুকুল জ্যোতি চাকমা বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সীমান্তপথের দুর্বলতা এবং মাদকের চাহিদা—সব মিলিয়েই সংকট জটিল হয়েছে। তাই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কৌশল।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম মনে করেন, শুধু খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করে লাভ হবে না। যারা আড়াল থেকে অর্থায়ন করে, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনা করে, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগও বাড়াতে হবে।

উল্লেখ্য, পাঁচ বছরে লাখো গ্রেপ্তার, সাড়ে চার লাখের বেশি মামলা এবং বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পরও দেশের অলিগলি থেকে সীমান্ত পর্যন্ত সক্রিয় রয়েছে মাদকের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। তাই শুধু খুচরা কারবারিদের গ্রেপ্তার করে সফলতার দাবি যথেষ্ট নয়। এই অন্ধকার সাম্রাজ্যের নেপথ্যের গডফাদার, অর্থদাতা ও প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াই পূর্ণ সফলতা পাবে না। যতদিন মূল হোতারা অধরা থাকবে, ততদিন নতুন মুখ নিয়ে ফিরে আসবে একই অন্ধকার ব্যবসা।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: