একসময় আশুরা এলেই গ্রামবাংলার হাট-বাজার, পাড়া-মহল্লা ও জনপদে ভেসে আসত জারিগানের করুণ সুর। কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার স্মৃতিবিজড়িত এই লোকসংগীত ছিল ধর্মীয় আবেগ, মানবতা, ত্যাগ ও সত্যের শিক্ষার এক অনন্য মাধ্যম। তবে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহে শতবর্ষী এই লোকঐতিহ্য এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দশক আগেও মহররম মাসজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় জারিগানের আসর বসত। শিল্পীরা দল গঠন করে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে কারবালার ইতিহাসভিত্তিক জারিগান পরিবেশন করতেন। আশুরার দিনকে কেন্দ্র করে এসব আয়োজন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। গানের কথায় কারবালার বেদনাময় কাহিনি শুনে অনেক শ্রোতার চোখে অশ্রু ঝরত।
নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়ীয়া, চকবাদকয়া ও মুন্জিলপুকুর এলাকায় আশুরা উপলক্ষে দুই থেকে তিন দিনব্যাপী মেলার আয়োজন হতো। এসব মেলায় লাঠিখেলা ও জারিগান ছিল দর্শকদের প্রধান আকর্ষণ। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করতে ভিড় জমাতেন।
কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। টেলিভিশন, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে লোকসংস্কৃতির এই ধারার প্রতি তরুণদের আগ্রহ কমে এসেছে। ফলে আগের মতো জারিদল গঠন কিংবা নিয়মিত পরিবেশনার দৃশ্য এখন খুব কমই দেখা যায়।
সংস্কৃতিবিদদের মতে, জারিগান শুধু একটি সংগীতধারা নয়, এটি বাংলার লোকঐতিহ্য, ইতিহাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাযথ সংরক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে একের পর এক প্রবীণ জারিশিল্পী হারিয়ে যাচ্ছেন। জীবিত শিল্পীদের অনেকেরই উত্তরসূরি না থাকায় ঐতিহ্যটি আরও সংকটের মুখে পড়েছে।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলছেন, বিদ্যালয়-কলেজের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে জারিগানকে অন্তর্ভুক্ত করা, নতুন শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জারিশিল্পীদের তালিকা প্রণয়ন ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই ঐতিহ্য রক্ষা করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আশুরার জারিগান বাঙালির লোকসংস্কৃতির এক মূল্যবান সম্পদ। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতায় জারিগানের ইতিহাস পড়বে, কিন্তু আর শুনতে পাবে না তার সেই হৃদয়স্পর্শী করুণ সুর।