লাখাইয়ে খাল পুনঃখনন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ, ইজিপিপিতে লুকোচুরি

এম এ রাজা, হবিগঞ্জ

সারাদেশ

হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক ইউনিয়নের সাতাউক ও মুড়িয়াউক খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অতিদরিদ্রদের জন্য পরিচালিত কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে (ইজিপিপি) ব্যাপক অনিয়ম ও

2026-06-24T20:14:59+00:00
2026-06-24T20:14:59+00:00
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
সারাদেশ
লাখাইয়ে খাল পুনঃখনন ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ, ইজিপিপিতে লুকোচুরি
এম এ রাজা, হবিগঞ্জ
বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ৮:১৪ পিএম 
ছবি: ভোরের ডাক
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক ইউনিয়নের সাতাউক ও মুড়িয়াউক খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অতিদরিদ্রদের জন্য পরিচালিত কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে (ইজিপিপি) ব্যাপক অনিয়ম ও লুকোচুরির অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিকের উপস্থিতি, কর্মদিবস এবং প্রকৃত কাজের পরিমাণ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

জানা গেছে, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে লাখাই উপজেলার মুড়িয়াউক ইউনিয়নে দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

এর মধ্যে সাতাউক উত্তর গ্রাম থেকে বলভদ্র নদী পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন প্রকল্পের জন্য মোট ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮৯ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে শ্রমিক মজুরি বাবদ প্রায় ৫৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯৭ জন শ্রমিকের ৪০ দিন কাজ করার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে, সুতাং নদী থেকে তেঘরিয়া পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ৯৯ লাখ ৫১ হাজার ৯১০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে ২৯৮ জন শ্রমিকের ৪০ দিন কাজ করার কথা।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কাগজে-কলমে নির্ধারিত সংখ্যক শ্রমিক দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক কম শ্রমিক দিয়ে কাজ পরিচালনা করা হচ্ছে। অনেক শ্রমিক নিয়মিত কাজে উপস্থিত না থেকেও তাদের নামে হাজিরা দেখানো হচ্ছে। এছাড়া নির্ধারিত পরিমাণ মাটি খনন না করেই কাজ সম্পন্ন দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সরকারের এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষির উন্নয়নের পাশাপাশি অতিদরিদ্র মানুষের হাতে কাজ তুলে দেওয়া। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনিয়মের কারণে প্রকৃত উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সরকারি অর্থের অপচয় ঘটছে।

সূত্র জানায়, সাতাউক ও মুড়িয়াউক খাল পুনঃখনন প্রকল্প দুটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মুড়িয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নোমান মিয়া এবং প্যানেল চেয়ারম্যান আলা উদ্দিন। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস।

তবে প্রকল্পের অগ্রগতি ও শ্রমিকদের কর্মদিবস নিয়ে প্রকল্প সভাপতি এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার বক্তব্যে পাওয়া গেছে স্পষ্ট গরমিল।

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রকল্প সভাপতি নোমান মিয়ার দাবি, সাতাউক খালের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে শ্রমিকরা প্রায় ৩৫ দিন কাজ করেছেন। অন্যদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রাকিব জানান, ওই খালে শ্রমিকরা ৩৪ দিন কাজ করেছেন এবং কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৮৬ শতাংশ।

এ ছাড়া মুড়িয়াউক খালের বিষয়ে চেয়ারম্যানের দাবি, সেখানে ৩৮ দিন কাজ হয়েছে। কিন্তু উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই খালের কাজের অগ্রগতি ৮১ শতাংশ এবং শ্রমিকরা ৩৬ কর্মদিবস কাজ করেছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মুড়িয়াউক খালের কাজ বন্ধ রয়েছে। সেখানে উপস্থিত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা বৃষ্টির কারণে ৪ থেকে ৫ দিন ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। তবে কয়েকজন শ্রমিক দাবি করেন, তারা ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত কাজ করেছেন।

অন্যদিকে, সাতাউক খালের সভাপতি কাজ চলমান থাকার দাবি করলেও সরেজমিনে খননকাজে কোনো শ্রমিককে দেখা যায়নি। দুপুর ১২টার দিকে খাল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে কয়েকজন নারী শ্রমিকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, সকালে কাজে গেলেও চেয়ারম্যান (প্রকল্প সভাপতি) তাদের বলেছেন কাজ শেষ হয়ে গেছে। ফলে প্রায় দুই ঘণ্টা কাজ করে তারা বাড়ি ফিরে যান।

আরেক নারী শ্রমিক বলেন, ‘আমরা সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা বা ১টা পর্যন্ত কাজ করি।’

এ সময় একজন নারী শ্রমিক স্বীকার করেন, তার স্বামীর পরিবর্তে তিনি কাজ করছেন। অপর এক শ্রমিক জানান, চার-পাঁচ দিন পরপর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিস থেকে লোক এসে হাজিরা নিয়ে যায়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক টমটম চালক শ্রমিক কম উপস্থিত হওয়া এবং একটি গ্রামের শ্রমিকরা কাজে না আসার অভিযোগ তুললে প্রকল্প সভাপতির প্রতিনিধি মিয়া তার উপর চড়াও হন।

পরে সভাপতির প্রতিনিধি বলেন, ভুল বোঝাবুঝির কারণে একটি গ্রামের শ্রমিকরা কাজে আসেনি। এসময় তিনি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে গেছে বলে জানান ।

এ বিষয়ে মুড়িয়াউক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রকল্প সভাপতি নোমান মিয়া বলেন, ‘কাজ সঠিকভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। সাতাউক খালের কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। সেখানে প্রায় ৩৫ দিন শ্রমিকরা কাজ করেছেন। মুড়িয়াউক খালে ৩৮ দিন কাজ হয়েছে। বৃষ্টির পর বাকি কাজ শেষ করা হবে।’

অপরদিকে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘সাতাউক খালের ৮৬ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং শ্রমিকরা ৩৪ দিন কাজ করেছেন। মুড়িয়াউক খালের ৮১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে, শ্রমিকরা ৩৮ দিন কাজ করেছেন । শ্রমিকদের কাজে কিছুটা ঘাটতি ও তদারকির সমস্যা রয়েছে। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো কাজের অজুহাতে নিম্নআয়ের মানুষের হাতে কিছু অর্থ পৌঁছে দেওয়া। প্রত্যেকে তাদের হাজিরা মোতাবেক মজুরি পরিশোধ করা হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকরা নির্ধারিত পরিমানে কাজ করেন না। একজনের পরিবর্তে অন্যজন কাজ করার কথা স্বীকারও করেন তিনি। 

এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।


  বিষয়:   হবিগঞ্জ  খাল পুনঃখনন  অনিয়মের অভিযোগ  লুকোচুরি 


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: