ষড়ঋতুর এই দেশে ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে ফোটে ভিন্ন ভিন্ন ফুল। ঋতু পরিক্রমায় প্রকৃতিতে এখন গ্রীষ্মকাল, গ্রীষ্মের দ্বিতীয় মাস জ্যৈষ্ঠের শেষ সপ্তাহ চলছে। কদিন পরই আসবে বর্ষাকাল; বর্ষার আগমনী বার্তা নিয়ে প্রকৃতিতে ফুটেছে বর্ষার প্রতীক কদম ফুল। গ্রীষ্মের তাপদাহ উপেক্ষা করে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে বর্ষার দূত কদম ফুল।
কদম ফুলের শুভ্রতা ছড়িয়েছে প্রকৃতিতে, মিষ্টি গন্ধ ভাসছে বাতাসে। প্রকৃতির এমন চিরচেনা রূপই জানান দিচ্ছে বর্ষার আগমন।
কদম শুধু একটি ফুলই নয়, বাঙালির আবেগ-অনুভূতির আরেক নাম কদম ফুল। প্রায় প্রতিটি বাঙালির শৈশব আর কৈশোরের স্মৃতিতে জড়িয়ে আছে এই ফুল। যুগে যুগে কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গীতিকাররাও কদম গাছ ও ফুল নিয়ে লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, গল্প ও গান।
প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তাঁর একটি জনপ্রিয় গানে লিখেছেন, যদিও তখন আকাশ থাকবে বৈরী, কদমগুচ্ছ হাতে নিয়ে আমি তৈরি। নামিবে আঁধার বেলা ফুরাবার ক্ষণে, মেঘমল্লার বৃষ্টিরও মনে মনে। কদমগুচ্ছ খোঁপায় জড়ায়ে দিয়ে, জলভরা মাঠে নাচিব তোমারে নিয়ে। যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো—চলে এসো এক বরষায়। এছাড়াও তিনি ‘বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছেন।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কদম ফুলকে প্রেম, বিরহ ও প্রকৃতি জাগরনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি তাঁর গানে লিখেছেন, ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।’
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর একটি গানে লিখেছেন, ‘বাঁশি বাজায় কে কদমতলায় ওলো ললিতে শুনে সরে না পা পথ চলিতে।’
পল্লীকবি জসিম উদ্দিন তাঁর ‘পল্লী বর্ষা’ কবিতায় লিখেছেন, ‘কাহার ঝিয়ারী কদম্বশাখে নিঝুম নিরালায়, ছোট ছোট রেণু খুলিয়া দেখিছে অস্ফুট কলিকায়।’
তিনি তাঁর একটি বিখ্যাত গানে লিখেছেন, ‘প্রাণ সখীরে ঐ শোন কদম্ব তলে বংশী বাজায় কে। বংশী বাজায় কে রে সখী, বংশী বাজায় কে। আমার মাথার বেণী খুইলা দিমু, তারে আইনা দে।’
এছাড়াও রাধা কৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে রচিত বহু গীতিকারের অসংখ্য গানে কদম গাছ ও ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়।
কদম গাছ একটি বহুবর্ষজীবী ও দ্রুত বর্ধনশীল বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম নিওলামার্কিয়া ক্যাডাম্বা। এটি মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের স্থানীয় উদ্ভিদ। কদম গাছ বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও থাইল্যান্ডে বেশি জন্মে। এটি একটি মাঝারি থেকে বৃহদাকার বৃক্ষ। গাছগুলো সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
এর কাণ্ড সোজা হয় এবং ডালপালাগুলো ভূমির সমান্তরালে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে একটি বিশাল ছাতার আকৃতি তৈরি করে। দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় বনায়ন, রাস্তার ধারে ছায়া প্রদান এবং পার্কের শোভাবর্ধনে এই গাছ অত্যন্ত জনপ্রিয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় কদম গাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, মাটির ক্ষয় রোধে ভূমিকা রাখে। এর বিস্তৃত শাখা-প্রশাখা ও পাতা রোদ থেকে ছায়া প্রদান করে এবং তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
কদম গাছের পাতা ও ছালে রয়েছে বিভিন্ন ঔষধি গুণ। যেমন— জ্বর, কৃমির উপদ্রব এবং ক্ষত সারাতে এটি দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর নরম ও হালকা কাঠ দিয়ে দিয়াশলাই (ম্যাচ), কাগজ তৈরির মণ্ড, প্যাকিং বক্স এবং বিভিন্ন রকমের খেলনা তৈরি করা হয়। কদম গাছের ফুলই এর প্রধান আকর্ষণ। কদম ফুল সাধারণত জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ফোটে। কদম ফুল দেখতে ছোট বলের মতো গোলাকার এবং তুলতুলে নরম হয়। ফুলটি মূলত অসংখ্য ছোট ছোট হলুদ ও সাদা রঙের পরাগকেশরের সমন্বয়ে গঠিত হয়। এর ভেতরের অংশটি সাদা এবং বাইরের দিকটা উজ্জ্বল হলুদ বা কমলা রঙের হয়ে থাকে।
কদম ফুল কাঠবিড়ালি ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি খেয়ে থাকে। এছাড়াও, মিষ্টি গন্ধযুক্ত এই ফুলটি থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নত মানের সুগন্ধি ও আতর তৈরি করা হয়। বিশেষ করে ভারতের কনৌজ অঞ্চলে কদম ফুল থেকে ‘রূহ কদম্ব’ নামে এক ধরনের আতর তৈরি করা হয়, যা সুগন্ধির জগতে একটি অত্যন্ত রাজকীয় এবং উচ্চ মূল্যের ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধি হিসেবে পরিচিত। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কদম গাছের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সৃষ্টি না হওয়ায় দিন দিন এর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এভাবে কমতে থাকলে হয়তো একদিন প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাবে কদম গাছ; হারিয়ে যাবে বর্ষার প্রতীক, বর্ষার দূত কদম ফুল। তখন নতুন করে হয়তো আর লেখা হবে না কদম নিয়ে কোনো কবিতা, গল্প বা গান।