একবেলা খাবার আর ৫০ টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে যাচ্ছে মুসার শৈশব

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

সারাদেশ

বয়স মাত্র ৯ বছর। এই বয়সে সমবয়সী অন্য শিশুদের হাতে থাকার কথা রঙিন পাঠ্যবই, খাতা-কলম কিংবা প্রিয় খেলনা। অথচ মুসার

2026-06-13T15:20:05+00:00
2026-06-13T15:20:05+00:00
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
সারাদেশ
একবেলা খাবার আর ৫০ টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে যাচ্ছে মুসার শৈশব
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩:২০ পিএম 
ছবি ভোরের ডাক
বয়স মাত্র ৯ বছর। এই বয়সে সমবয়সী অন্য শিশুদের হাতে থাকার কথা রঙিন পাঠ্যবই, খাতা-কলম কিংবা প্রিয় খেলনা। অথচ মুসার হাতে এখন শোভা পায় ময়লা-কালি মাখা কাপড়ের টুকরো, পানির বালতি আর ভারী যন্ত্রাংশ। শৈশবের আনন্দকে পেছনে ফেলে জীবিকার তাগিদে শ্রমিকের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে সে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মাহানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির মেধাবী ও চটপটে শিক্ষার্থী ছিল মুসা। রোল নম্বর ধরে শিক্ষকের ডাকে ‘উপস্থিত স্যার’ বলার দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। প্রায় এক বছর আগে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে থেমে যায় তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। বই-খাতা সরিয়ে রেখে জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় নামতে হয় তাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সদর উপজেলার পঁচিশ মাইল এলাকার মাহানপুর গ্রামে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করত মুসা। কিন্তু তার জীবনের গল্প আর দশটি শিশুর মতো স্বাভাবিক নয়। তার বাবা বাবু একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি, যিনি নিজের ভরণপোষণ কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম। অন্যদিকে, এক বছর আগে মুসাকে ফেলে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান তার মা জিন্নাত বেগম। ফলে মায়ের স্নেহ ও বাবার আশ্রয়—দুই-ই হারিয়ে কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে শিশুটি।

মায়ের চলে যাওয়া ও বাবার অক্ষমতার পর মুসার দায়িত্ব নেন তার বৃদ্ধ দাদি তমিজা খাতুন। স্নেহ-ভালোবাসায় কিছুদিন আগলে রাখলেও বার্ধক্যের কারণে একসময় তিনিও অসহায় হয়ে পড়েন। তখন এগিয়ে আসেন মুসার ফুফু খাদিজা বেগম। তিনি মুসাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দেন।

তবে খাদিজা বেগমের নিজের জীবনও সংগ্রামের। অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে কোনোমতে সংসার চালান তিনি। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারে আরও একটি মুখের খাবার জোগানো তার জন্য হয়ে পড়ে কঠিন। চরম দারিদ্র্য আর ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হয়েই এক বুক কষ্ট নিয়ে মুসাকে কাজে পাঠিয়ে দেন তিনি। কর্মস্থল হিসেবে ঠিক হয় ঠাকুরগাঁও পুলিশ লাইন এলাকার ‘মহেনের গ্যারেজ’।

গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায়, ৯ বছরের কোমলমতি শিশুটি এখন একজন পূর্ণাঙ্গ শ্রমিক। সকাল থেকে শুরু হয় তার কর্মব্যস্ততা। দূর থেকে পানি টেনে আনা, কাদা-মাটি মাখা গাড়ি ধোয়া, গ্যারেজের মালিক ও মেকানিকদের বিভিন্ন কাজ করে দেওয়া—সবকিছুই করতে হয় তাকে।

গ্যারেজ মালিক মহেন বাবু বলেন, প্রথমে আমি মুসাকে কাজে রাখতে চাইনি। কিন্তু তার পারিবারিক অবস্থা জানার পর মায়া হয়। কোনো কাজ না পেলে শিশুটির খাবারই জুটত না। তাই বাধ্য হয়ে তাকে কাজে রাখি।

শিশু মুসার সঙ্গে কথা হলে সে জানায়, সারাদিনের পরিশ্রমের বিনিময়ে সে পায় একবেলার দুপুরের খাবার ও দৈনিক ৫০ টাকা।

দিনভর হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে সন্ধ্যায় সেই ৫০ টাকার নোটটি নিয়ে ফুফুর বাড়িতে ফেরে মুসা। প্রতিদিনের উপার্জন তুলে দেয় ফুফুর হাতে। বিনিময়ে জোটে মাথা গোঁজার ঠাঁই, রাতের খাবার এবং পরদিন সকালের সামান্য আহার। নিজের দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা পেতেই প্রতিদিন শৈশবকে বিসর্জন দিচ্ছে সে।

মুসার নিষ্পাপ চোখে স্পষ্ট একরাশ শূন্যতা। যে বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সে সে বুঝে গেছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। পড়াশোনার প্রসঙ্গ উঠতেই মাথা নিচু করে ফেলে। হয়তো মনের গভীরে এখনো স্কুলের বারান্দা, সহপাঠীদের কোলাহল আর শিক্ষকদের স্নেহ তাকে টানে। কিন্তু গ্যারেজের পোড়া তেল আর মবিলের গন্ধ সেই স্বপ্নগুলোকে প্রতিনিয়ত মুছে দিচ্ছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম বলেন, বর্তমান বাজারে ৫০ টাকার মূল্য খুবই সামান্য। কিন্তু মুসার মতো শিশুর কাছে এটাই বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। পারিবারিক ভাঙন ও চরম দারিদ্র্যের কারণে প্রতিবছর হাজারো শিশু পড়াশোনা ছেড়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। শিশুশ্রম আইনত দণ্ডনীয় হলেও পেটের ক্ষুধার কাছে আইন যেন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

তিনি আরও বলেন, শুধু ঠাকুরগাঁও জেলাতেই গ্যারেজ, হোটেল, কামারের দোকানসহ বিভিন্ন কর্মস্থলে শত শত শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে।

সচেতন মহলের মতে, ৯ বছরের মুসার এই সংগ্রাম শুধু একজন শিশুর ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজব্যবস্থা ও ভেঙে পড়া পারিবারিক কাঠামোর নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। একবেলা খাবার আর ৫০ টাকার বিনিময়ে হারিয়ে যাচ্ছে একটি সম্ভাবনা, একটি ভবিষ্যৎ। গ্যারেজের কালো ময়লার আস্তরণে হয়তো চাপা পড়ে যাবে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নও।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: