দরজাটি কয়েকদিন ধরেই বন্ধ ছিল। ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছিল না। বারান্দার আলোও জ্বলছিল না। প্রথমে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। কারণ এ শহরে কারও ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি দেওয়াকে অনেকেই শোভন মনে করেন না। কিন্তু কয়েকদিন পর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকতেই মেলে অর্ধগলিত মরদেহ। এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, রাজধানী ঢাকার সাম্প্রতিক বাস্তবতা।
একের পর এক ফ্ল্যাট থেকে একা থাকা মানুষের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং নগরজীবনের একটি ভয়ংকর সামাজিক সংকট হিসেবে সামনে আসছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং আধুনিক জীবনযাপনের আড়ালে মানুষ ক্রমেই হারিয়ে ফেলছে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা। ফলে মৃত্যুর পরও দিনের পর দিন কারও খবর না পাওয়া এখন নগরবাসীর জন্য এক নির্মম বাস্তবতা।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় ৫৫ বছর বয়সী সেলিনা আফরোজের অর্ধগলিত মরদেহ। স্বামী ও দুই সন্তান দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় বসবাস করলেও তিনি ঢাকায় একাই থাকতেন। কয়েকদিন ধরে কোনো সাড়া না পাওয়ার পর প্রতিবেশীদের সন্দেহ হলে পুলিশ গিয়ে তার মরদেহ উদ্ধার করে। এই ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিলেও বাস্তবে এটি একক কোনো ঘটনা নয়। বরং গত কয়েক বছরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। একই শহর, একই গল্প : পল্লবীর ঘটনার কিছুদিন আগেই রাজধানীর মিরপুরে নূরজাহান বেগম নামে এক বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েকদিন ধরে তার ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে জানা যায়, তার সন্তানদের মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন বিদেশে বসবাস করেন এবং অন্যজনও প্রতিষ্ঠিত পেশাজীবী। কিন্তু সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান যতই শক্তিশালী হোক, জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ একা।
এর আগে খিলক্ষেতের লেকসিটি এলাকায় প্রবাসফেরত ফারুখ কবির বাদলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েকদিন ধরে যোগাযোগ না হওয়ায় পুলিশ দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করে। রাজধানীর বারিধারা, উত্তরা, বনশ্রী ও মোহাম্মদপুর এলাকাতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একই ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিটি ঘটনার পেছনের গল্প ভিন্ন হলেও একটি জায়গায় এসে সব গল্প মিলিত হয়, মানুষের চারপাশে মানুষ থাকলেও প্রকৃত অর্থে কেউ কারও খোঁজ রাখছে না।
বদলে যাচ্ছে পরিবারের সংজ্ঞা : বাংলাদেশের সমাজ দীর্ঘদিন ধরে যৌথ পরিবারভিত্তিক সংস্কৃতির জন্য পরিচিত ছিল। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা সন্তান-নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস করতেন। অসুস্থতা, বিপদ কিংবা মানসিক সংকটের সময় পাশে কাউকে পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা এবং বিদেশমুখী জীবনের কারণে সেই কাঠামো দ্রুত বদলে গেছে।
আজকের নগরজীবনে বাবা-মা ঢাকায়, ছেলে কানাডায়, মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা অন্য কোনো শহরে, এটাই যেন স্বাভাবিক চিত্র। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রয়োজনে পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতার মূল্য দিতে হচ্ছে প্রবীণদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের জীবনমান বাড়ালেও পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতি নতুন সামাজিক সংকট তৈরি করছে। অর্থ পাঠানো কিংবা ভিডিও কলে কথা বলাই সব দায়িত্ব পূরণ করে না। একজন মানুষের প্রয়োজন হয় বাস্তব উপস্থিতি, মানসিক সঙ্গ এবং দৈনন্দিন খোঁজখবর।
প্রতিবেশী সংস্কৃতির অবক্ষয় : একসময় মহল্লাভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় প্রতিবেশীরা ছিলেন আত্মীয়ের মতো। কারও বাসার দরজা একদিন বন্ধ থাকলে খোঁজ নেওয়া হতো। অসুস্থ হলে পাশে দাঁড়াতেন আশপাশের মানুষ। এখন একই ভবনে বছরের পর বছর বসবাস করেও অনেকে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের নাম জানেন না। নগরের ব্যস্ততা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সংস্কৃতি মানুষকে ক্রমশ একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ফলে একজন মানুষ মারা যাওয়ার পরও কয়েকদিন, কখনো কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত বিষয়টি অজানাই থেকে যাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি কেবল পারিবারিক নয়, সামাজিক বন্ধনেরও দুর্বলতার লক্ষণ।
ফোন আছে, সংযোগ নেই : সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, মানুষ এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, কিন্তু সম্পর্কের দিক থেকে বেশি বিচ্ছিন্ন। স্মার্টফোন, ভিডিও কল, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যুক্ত করতে পারে। কিন্তু এসব প্রযুক্তি বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হতে পারেনি। একই পরিবারের সদস্যরা একই ঘরে বসেও অনেক সময় আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ডুবে থাকেন। কথোপকথন কমছে, পারস্পরিক অনুভূতির আদান-প্রদান কমছে, কমছে একে অপরের প্রতি মনোযোগ। ফলে পরিবারের সদস্যরা একে অপরের শারীরিক কিংবা মানসিক অবস্থার খবরও অনেক সময় জানেন না। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত বন্ধু থাকলেও বাস্তবে একজন মানুষের পাশে নির্ভরযোগ্য কাউকে না পাওয়া আধুনিক যুগের বড় সংকটগুলোর একটি।
নিঃসঙ্গতা এখন জনস্বাস্থ্য সমস্যা : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একাকীত্বকে এখন জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি নিঃসঙ্গতা মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
নিঃসঙ্গ মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা, স্মৃতিভ্রংশ, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের আয়ুষ্কালও কমিয়ে দিতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও দ্রুত নগরায়ণের ফলে একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু প্রবীণ নয়, ঝুঁকিতে তরুণরাও : অনেকেই মনে করেন, একাকীত্ব কেবল প্রবীণদের সমস্যা। বাস্তবতা ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী অবিবাহিত তরুণ-তরুণী, প্রবাসফেরত ব্যক্তি কিংবা একা বসবাসকারী কর্মজীবী মানুষদের মধ্যেও নিঃসঙ্গতা দ্রুত বাড়ছে। প্রতিযোগিতামূলক জীবন, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সম্পর্কের অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক তরুণ মানসিক সংকটে ভুগছেন। অনেকেই নিজের সমস্যার কথা কাউকে বলতে পারেন না। ফলে বিষণ্নতা, আত্মহত্যাপ্রবণতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নানা সমস্যা বাড়ছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা কমাতে কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা। প্রবীণ বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, একা থাকা আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।
তিনি মনে করেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবাসিক ভবনগুলোতে নিয়মিত খোঁজখবরের ব্যবস্থা, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য সামাজিক সাপোর্ট নেটওয়ার্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিস্তারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায়, প্রতিদিনের একটি ফোনকল, একটি খোঁজ নেওয়ার বার্তা কিংবা কয়েক মিনিটের আন্তরিক আলাপও একজন মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
উল্লেখ্য, পল্লবীর সেলিনা আফরোজ, মিরপুরের নূরজাহান বেগম কিংবা খিলক্ষেতের ফারুখ কবির বাদল, তাদের মৃত্যুর ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এগুলো আমাদের সমাজের আয়নায় প্রতিফলিত এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
কংক্রিটের নগর যত বড় হচ্ছে, মানুষের ভেতরের শূন্যতাও যেন তত বিস্তৃত হচ্ছে। ফ্ল্যাটের দরজা, লিফট আর ডিজিটাল স্ক্রিনের আড়ালে আমরা হয়তো ক্রমেই হারিয়ে ফেলছি সম্পর্কের সেই উষ্ণতা, যা একসময় এই সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল। প্রশ্নটি তাই শুধু একজন মানুষের মৃত্যুকে ঘিরে নয়; প্রশ্নটি আমাদের সবাইকে নিয়ে, প্রযুক্তির এই যুগে আমরা কি সত্যিই সংযুক্ত, নাকি নিঃশব্দে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছি?