ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটছে না। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা ও বড় জলসম্পদ প্রকল্প বাস্তবায়নে কৌশল বদলাচ্ছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক অগ্রগতি না থাকায় খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় এখন চীনের সহযোগিতার দিকেও ঝুঁকছে ঢাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানে ভারতের বিভিন্ন বাঁধ-বিশেষ করে ফারাক্কা ব্যারেজ-শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানিপ্রবাহ কমিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকায় উত্তরের কৃষি অঞ্চলও চাপের মুখে রয়েছে।
ঢাকার একটি গবেষণা সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে অন্তত ৭৯টি নদী ইতোমধ্যে শুকিয়ে গেছে বা শুকিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। এতে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মেগা প্রকল্প
এই পরিস্থিতিতে সরকার প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলারের ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প এবং চীন-সমর্থিত ‘তিস্তা মেগা প্রকল্প’ এগিয়ে নিচ্ছে।
পদ্মা ব্যারাজ: বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সরবরাহ এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা।
তিস্তা মেগা প্রকল্প: নদীভাঙন রোধ, ভূমি পুনরুদ্ধার ও কৃষিজমি সুরক্ষার সমন্বিত উদ্যোগ।
১৯৭৫ সালে ফারাক্কার আগে গড় পানিপ্রবাহ যেখানে প্রায় ৭০ হাজার কিউসেক ছিল, তা বর্তমানে অনেক সময় ১০-২০ হাজার কিউসেকে নেমে আসে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী থাকলেও মূলত গঙ্গা ও তিস্তা নিয়েই মূল বিরোধ। ২০১১ সালে তিস্তা চুক্তি প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত হলেও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে।
সাবেক কূটনীতিকদের মতে, দীর্ঘদিনের অগ্রগতিহীনতা দুই দেশের সম্পর্কে চাপ সৃষ্টি করেছে এবং বাংলাদেশ বিকল্প সহযোগী হিসেবে চীনের দিকে ঝুঁকছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ভারতের কৌশলগত নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগজনক, কারণ এটি শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত।
পরিবেশগত উদ্বেগ
পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন, বড় ব্যারাজ ও বাঁধ প্রকল্প বদ্বীপ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। তাদের মতে, উজান থেকে নিশ্চিত পানিপ্রবাহ ছাড়া এসব প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও বিকল্প প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ওপর আরও নির্ভর করতে হবে।
সূত্র: নিক্কেই এশিয়া