নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার চানপাড়ায় অবস্থিত ডিবিকেপি প্রবীণ পুনর্বাসন ও পক্ষাঘাত চিকিৎসা কেন্দ্রে গত ছয় বছর ধরে বসবাস করছেন ৭৫ বছর বয়সী তুলি বেগম। পরিবারের সদস্যরা তাকে সেখানে রেখে যাওয়ার পর আর খোঁজ নিতে আসেননি বলে জানিয়েছেন তিনি।
জানা যায়, অসহায় ও অবহেলিত প্রবীণ নারী-পুরুষদের সেবা ও পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা প্রবীণদের আশ্রয় দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজন তুলি বেগম, যিনি ছয় বছর ধরে কেন্দ্রটিতেই জীবন কাটাচ্ছেন।
কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, তুলি বেগমের মা-বাবা বহু আগেই মারা গেছেন। তার একটি ভাই ও একটি বোন রয়েছে। ছয় বছর আগে তারা তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে রেখে যান। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
ঈদ এলেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ হয় না তুলি বেগমের। অন্যদের অনেকেই ঈদের সময় স্বজনদের কাছে গেলেও তার ভাগ্যে জোটে না সেই সুযোগ। ফলে ঈদের দিনগুলোও তার কাছে বিষণ্নতায় ভরা হয়ে ওঠে।
তুলি বেগম বলেন, ‘আমার ভাই আর বোনকে দেখতে ইচ্ছা করে। আমার বাড়ি যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কেউ আমার খোঁজ-খবর নেয় না। আমার খুব কষ্ট লাগে। এ জীবন আর ভালো লাগে না।’
তিনি আরো জানান, বিয়ে না হওয়ায় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একাকিত্বই তার সবচেয়ে বড় সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুনর্বাসন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা জানান, এখানে থাকা অনেক প্রবীণকে ঈদের সময় পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে নিয়ে যান এবং ঈদ শেষে আবার কেন্দ্রে ফিরিয়ে দেন। তবে তুলি বেগমের ক্ষেত্রে এমনটি কখনো ঘটেনি।
ডিবিকেপি প্রবীণ পুনর্বাসন ও পক্ষাঘাত চিকিৎসা কেন্দ্রের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ আশিকুর রহমান বলেন, ‘অনেক পরিবার প্রবীণ সদস্যদের বোঝা মনে করে আমাদের কেন্দ্রে রেখে যান। আমরা তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও যত্নের সঙ্গে সেবা দিয়ে থাকি।’
তিনি বলেন, ‘আপনজনদের থেকে দূরে থাকার যে কষ্ট, তা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। তবে আমরা চেষ্টা করি তাদের সেই বেদনা কিছুটা লাঘব করতে। ঈদসহ যেকোনো আনন্দ-উৎসব আমরা তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিই।’
তিনি আরো বলেন, ‘তুলি বেগম গত ছয় বছর ধরে আমাদের সঙ্গে আছেন। প্রতি ঈদই তিনি এখানে কাটান। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে না পারাটা তার জন্য কষ্টের হলেও আমরা চেষ্টা করি তাকে পরিবারের অভাব অনুভব করতে না দিতে।’
প্রবীণদের প্রতি পারিবারিক অবহেলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি আবারও সামনে এনে দিয়েছে তুলি বেগমের জীবনকাহিনি। জীবনের শেষ বয়সে তার একটাই আকাঙ্ক্ষা—একবার হলেও আপনজনদের দেখা পাওয়া।