খাদ্যে বিষক্রিয়ার কারণে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এর মূল কারণ খাদ্যদ্রব্যের নিরাপত্তার অভাব। শাক-সবজি ও ফলমূলে সীমাহীনভাবে কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে এক কেজি কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন, সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে তিন কেজি। আবার বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্য রপ্তানির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও খাদ্যের নিরাপত্তাজনিত ঘাটতির কারণে সেই বাজারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাত নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন খাদ্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) ফেলোশিপ কার্যক্রমের আওতায় ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ফেলোশিপের ইনসেপশন সেমিনার ও অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
শনিবার (২৩ মে) দুপুরে রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম সড়কে অবস্থিত বিএফএসএ কার্যালয়ে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
নিরাপদ খাদ্য খাতে গবেষণার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের লক্ষ্যে বিএফএসএ ‘ফেলোশিপ নীতিমালা-২০২৪’-এর আওতায় “ফেলোশিপ কার্যক্রম-২০২৬” চালু করেছে।
বিএফএসএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। স্বাগত বক্তব্য দেন বিএফএসএর সদস্য ড. মোহাম্মদ মোস্তফা ও ড. মোহাম্মদ শোয়েব।
খাবারের কারণে অসুস্থ হয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে উল্লেখ করে মো. আব্দুল বারী বলেন, খাদ্যে ভেজাল সারা পৃথিবীর সমস্যা হলেও আমাদের দেশে এটি আরও প্রকট। ২০ বছর আগেও এত ক্যান্সার ছিল না, এখন ক্যান্সারের প্রকোপ অনেক বেড়েছে।
তিনি বলেন, খাদ্যে বিষক্রিয়ায় শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে। অথচ খাদ্যে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার প্রয়োগ করলে এ পরিস্থিতি অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। তাই সরকার জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দিচ্ছে।
খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কাজ করার সময় প্রত্যেককে নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহি থাকতে হবে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে দেশ এগিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। তবে খাদ্যের বিশুদ্ধতার অভাবে রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে হবে, কারণ এসব দেশে রপ্তানির ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়।
বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে কার্যক্রম জোরদারের তাগিদ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতি মাসে বাজারগুলোতে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। এতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়বে এবং মানুষ জানতে পারবে তারা কী খাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে যেখানে এক কেজি কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন, সেখানে তিন কেজি ব্যবহার করা হচ্ছে। আমে এমন কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়, যা পাকতে সময় বাড়িয়ে দেয়। পাবদা মাছ ও শসাতেও নিয়মিত স্প্রে করা হয়।
আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অপশাসন ও দুর্নীতির কারণে সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে এবং পদোন্নতিসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানো হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কাজের ক্ষেত্রে দুই ধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে—একটি বিবেকের কাছে, অন্যটি আইনের কাছে। কর্মকর্তাদের সততা ও দক্ষতা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যেতে পারে না।
তিনি জানান, প্রতি বছর প্রায় ১ শতাংশ কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। এ কারণে গ্রামগুলোকে কৃষি উৎপাদনমুখী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে খাদ্য সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা বলেন, বর্তমানে খাদ্যে ভেজাল নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। জাতিকে এ থেকে রক্ষা করতে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
তিনি বিএফএসএর আর্থিক সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, গবেষণায় বরাদ্দের যে ঘাটতি রয়েছে, তা দূর করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ফেলোরা খাদ্যখাতের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানের পরামর্শ দেবেন।
তিনি আরও বলেন, ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি না হওয়া পর্যন্ত এ সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না।
সভাপতির বক্তব্যে মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ফেলোশিপের অধিকাংশ গবেষণা খাদ্যবিষয়ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হবে। ভবিষ্যতে গবেষণার জন্য বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস জেবা বলেন, এই ফেলোশিপ আমার মতো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষকদের অনুপ্রাণিত করবে এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
উল্লেখ্য, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো এ ফেলোশিপ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এ বছর সাধারণ ফেলোশিপ–১ (এমএস/সমমান) ক্যাটাগরিতে আবেদন আহ্বান করা হলে মোট ৩২৩টি আবেদন জমা পড়ে। সেখান থেকে ২০ জন ফেলোকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়।
ফেলোশিপ নীতিমালায় গবেষণার জন্য ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খাদ্য অণুজীববিজ্ঞান, খাদ্য রসায়ন, খাদ্য বিষবিদ্যা, খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উদীয়মান প্রযুক্তি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
সাধারণ ফেলোশিপের আওতায় প্রতি ফেলোকে মাসিক ৭ হাজার টাকা হারে এক বছরে মোট ৮৪ হাজার টাকা প্রদান করা হবে। এছাড়া সুপারভাইজারের সম্মানী হিসেবে এককালীন ৩০ হাজার টাকা এবং গবেষণা ব্যয় বাবদ এককালীন ৫০ হাজার টাকাসহ প্রতিজন ফেলোর জন্য মোট ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ব্যয় হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে ফেলোর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি এবং নীতিমালা অনুযায়ী এমফিল (সাধারণ ফেলোশিপ–২) ও পিএইচডি (উর্ধ্বতন ফেলোশিপ) পর্যায়েও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
নির্বাচিত ফেলোদের মধ্যে রয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেহেনা সুলতানা আলো, সাইফুল ইসলাম, রাফি হাসনাত সরকার, লাবিব শাহরিয়ার সিয়াম ও আফিয়া মুরশিদা তিষা; বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. তানভীরুল ইসলাম, শাহরিয়ার আহমেদ, শ্রীমা মণ্ডল বর্ষা, সাক্ষ্যজিৎ সাহা পারিজাত, নুসরাত জাহান নিজু ও মো. সাহাব উদ্দিন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহফুজ তালুকদার ও সিনজুরি হক সোহা; চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবরিনা সিফাত, মো. ইবনুল বখতিয়ার কাইফ ও জান্নাতুল ফেরদৌস জেবা; সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. নাজমুল হাসান আরফিন; শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাহনুমা তাবাসসুম তাকওয়া এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার মো. হাবিবুর রহমান প্রমুখ।