আজকাল পৃথিবী ক্রমশ কোলাহলপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং আমাদের ব্যবহার করা স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাওয়ায়, পরিপূর্ণ আরামের ঘুম পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবে ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি অপরিহার্য জৈবিক প্রয়োজন। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, প্রাপ্তবয়স্কদের স্মৃতিশক্তি সুসংহতকরণ এবং প্রবীণদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উন্নয়ন—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ঘুম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিশু বা নবজাতকের বয়স যত কম, ঘুমের প্রয়োজন তত বেশি। সাধারণভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের কার্যকারিতা বজায় রাখতে প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে আমাদের শরীর ৯০ মিনিটের চক্রের মধ্য দিয়ে যায়। পরিপূর্ণ সতেজ বোধ করার জন্য, প্রতি ২৪ ঘণ্টায় চার থেকে ছয়টি এই ঘুমের চক্র প্রয়োজন।
ঘুমের প্রতিটি চক্রের চারটি স্বতন্ত্র ধাপ রয়েছে। প্রথম ধাপ হলো এনআরইএম পর্যায় ১ (হালকা ঘুম)। এটি ‘ঘুমিয়ে পড়া’ পর্যায় হিসেবে পরিচিত এবং সাধারণত ৫-১০ মিনিট স্থায়ী হয়। এই সময়ে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ধীরে ধীরে কমে যায়, কিন্তু সহজেই জাগ্রত হওয়া সম্ভব।
দ্বিতীয় ধাপ হলো এনআরইএম পর্যায় ২ (হালকা ঘুম)। এটি আমাদের ঘুমের প্রায় অর্ধেক সময়কে তৈরি করে। এই পর্যায়ে হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে যায় এবং শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। মস্তিষ্কের প্রক্রিয়াকরণ এবং স্মৃতিশক্তি বজায় রাখার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় ধাপ এনআরইএম পর্যায় ৩ (গভীর ঘুম)। এটি পুনরুদ্ধারের প্রধান পর্যায়। এই সময়ে শরীর পেশী তৈরি করে, হাড় মেরামত করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়। তবে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষ এই গভীর ঘুমে কম সময় ব্যয় করে, যার ফলে হালকা ঘুমের সময় বাড়ে।
চতুর্থ ধাপ হলো আরইএম ঘুম (স্বপ্নের ঘুম)। ৯০ মিনিটের চক্রের মধ্যে এটি ঘটে এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শেখা এবং মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। এই সময়ে মস্তিষ্ক অত্যন্ত সক্রিয় থাকে, কিন্তু পেশীগুলো অস্থায়ী পক্ষাঘাতে থাকে, যাতে স্বপ্নের কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হয়।
বয়স অনুযায়ী প্রস্তাবিত ঘুমের সময় হলো:
০-৩ মাস: ১৪-১৭ ঘণ্টা
৪-১২ মাস: ১২-১৬ ঘণ্টা
১-৫ বছর: ১০-১৪ ঘণ্টা
৬-১২ বছর: ৯-১২ ঘণ্টা
১৩-১৮ বছর: ৮-১০ ঘণ্টা
১৯-৬৪ বছর: ৭-৯ ঘণ্টা
৬৫+ বছর: ৭-৯ ঘণ্টা
শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম ভালো মনোযোগ, মানসিক নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও পর্যাপ্ত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ। সাত ঘণ্টার কম ঘুম নিয়মিত হলে ওজন বৃদ্ধি, ডায়াবেটিস, হৃদরোগের ঝুঁকি, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। সুতরাং বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।