কক্সবাজারের প্রধান তিন সমুদ্র সৈকত লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলীতে প্লাস্টিক দূষণ ক্রমেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। ঘুরতে আসা পর্যটকরা পানির বোতল, পলিথিন, চিপসের প্যাকেট, খাবারের মোড়ক ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকসামগ্রী সৈকতেই ফেলে যাচ্ছেন। ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি নষ্ট হচ্ছে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। একই সঙ্গে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হচ্ছে শঙ্কা।
পর্যটন মৌসুম, সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিনে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে এই তিন সৈকতে। পর্যটকদের ব্যবহৃত প্লাস্টিকসামগ্রী যথাযথভাবে নির্দিষ্ট স্থানে না ফেলার কারণে বালিয়াড়ি ও সৈকতের বিভিন্ন অংশে বর্জ্য জমার আশঙ্কা বাড়ছে। সৈকতে বারং বার প্রচারণা সত্ত্বেও কোনোভাবেই রোধ হচ্ছে না এই দূষণ।
সরেজমিন এই তিন সৈকত ঘুরে দেখা গেছে, প্লাস্টিকের বর্জ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কোথাও পানি কিংবা কোমল পানিওর বোতল, কোথাও ওয়ান টাইম চায়ের কাপ, কোথাও বা আবার চিপসের খালি প্যাকেট, ওয়ানটাইম খাবারের প্যাকেট। সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য দেখা গেছে সুগন্ধা পয়েন্টে। মূল সড়ক থেকে শুরু করে সৈকত পর্যন্ত এমন কোনো স্থান নেই যেখানে বর্জ্য দেখা যায়নি।
সুগন্ধা সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি করা ‘প্লাস্টিক দানব’-এর চার দিকেই প্লাস্টিকের ছড়াছড়ি। সচেতনতা মূলক এই প্লাস্টিক স্থাপনা যেন কোনো কাজেই আসেনি। বরং সেটি বরাবর মূল সড়ক সংলগ্ন ঝাউবনে পর্যটকরা ওয়ানটাইম প্যাকেটে খাবার খাচ্ছেন আর খাওয়া শেষে সেখানেই সব ফেলে যাচ্ছেন।
সুগন্ধা সৈকতে আসা পর্যটক কামাল উদ্দিন বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক। আমরা এতটা অসচেতন হতে পারি কি ভাবে? আমাদের কি এতুটুক কমনসেন্স নেই? এত সুন্দর একটা সৈকত সেখানে এভাবে বর্জ্য ফেলার কোনো মানেই হয় না। সচেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্লাস্টিক কিংবা অন্য যে কোনো বর্জ্য ফেললে সেখানে অর্থদন্ড কিংবা প্রয়োজনে কারাদন্ড পর্যন্ত দিতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশে এমন আইন রয়েছে।
২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে আন্তর্জাতিক সাময়িকী মেরিন পলুশন বুলেটিন-এর এক গবেষণায় কক্সবাজার উপকূলের ১০টি পর্যটন ও অ-পর্যটন সৈকতে ৯০৩টি প্লাস্টিক বর্জ্য শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় ৭১ শতাংশ পর্যটননির্ভর সৈকতগুলোতে পাওয়া গেছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের অংশ ছিল ৬৯.৫৬ শতাংশ। গবেষণায় পরীক্ষা করা সব সৈকতই ক্লিন কস্ট ইনডেক্স অনুযায়ী অত্যন্ত নোংরা শ্রেণিতে পড়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতের বালু এবং সমুদ্রের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। এতে লাবণী সৈকতের উচ্চ জোয়ারের রেখায় প্রতি কেজি পলিতে গড়ে ৪৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে কলাতলীর নিম্ন জোয়ারের রেখায় পাওয়া যায় প্রতি কেজিতে ৩.৩টি কণা। সমুদ্রের পানিতেও তিনটি স্থানে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত আরও একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাধারণ দিনে কক্সবাজার সৈকত এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটে। ছুটির দিনে এই সংখ্যা বেড়ে ১ লাখ থেকে দেড় লাখে পৌঁছায়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (টঘউচ) তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার শহরে প্রতিদিন প্রায় ৩৪.৫ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এর একটি অংশ নালা ও খালের মাধ্যমে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।
লাবনী সৈকতে রেসকিউ কর্মী জাহিদুল ইসলামের সাথে কথা হয়। তিনি বলেন, এই সৈকতে পাওয়া যায়না এমন কোনো জিনিস নেই। এটা খুবই দুঃখজ্জনক যে আমরা সচেতন নই। নিজেরা ইচ্ছাকৃত সৈকতের পরিবেশকে নষ্ট করছি। বিচ আম্রেলার আশপাশে সবখানে ডাস্টবিন রয়েছে। কিন্তু মানুষ সেখানে ময়লা ফেলছে না।
লাবনী সৈকতে নেপাল থেকে ঘুরতে আসা জৈতি কারকি এবং উপেন্দ্র পুদাসাইনি। তারা জানান, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত সত্যি অনেক সুন্দর। কিন্তু মানুষকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। উপেন্দ্র দেখালেন ব্যবহার করা টিস্যু ফেলে না দিয়ে পকেটে ভরে রেখেছেন। ডাস্টবিন পেলে সেখানে ফেলে দেবেন।