ক্রান্তিকালে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান শহীদ জিয়াউর রহমান

আবদুর রহমান মল্লিক

জাতীয়

‘বল বীর চির উন্নত মম শির’। উন্নত শির দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের নাম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। দেশের ক্রান্তিকালে সীমাহীন ধৈর্য ও

2026-11-07T10:38:23+00:00
2026-11-07T10:47:46+00:00
  শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬,
২৩ কার্তিক ১৪৩৩
 
শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয়
আজ মহান জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস
ক্রান্তিকালে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান শহীদ জিয়াউর রহমান
আবদুর রহমান মল্লিক
শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৮ এএম  আপডেট: ০৭.১১.২০২৬ ১০:৪৭ এএম
ফাইল ছবি
‘বল বীর চির উন্নত মম শির’। উন্নত শির দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের নাম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। দেশের ক্রান্তিকালে সীমাহীন ধৈর্য ও শৌর্য-বীর্য নিয়ে যিনি দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেনাবাহিনীসহ দেশের মানুষের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন তাঁর প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার জন্য। স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে তিনি যে আস্থার জায়গায় ছিলেন তেমনি ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরেও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষ জাতির ক্রান্তিলগ্নে তাকেই বেছে নিয়েছিলেন সঠিক নেতৃত্বের জন্য। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয়, রোমাঞ্চকর এবং সুদূরপ্রসারী সন্ধিক্ষণ হলো ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫। সেনাবাহিনীতে জিয়াউর রহমান জনপ্রিয় হলেও রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার উত্থান ছিল ঘূর্ণিঝড়ের  প্রবল উত্থানে প্রকম্পিত।  

৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার এই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান কেবল তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক শূন্যতা দূর করে একটি জাতিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়নি, বরং বিশ্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দীর্ঘ পরিক্রমায় এটিকে একটি একক, অভূতপূর্ব এবং তুলনাহীন ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। এই সেই ঐতিহাসিক ক্ষণ, যেখানে একটি জাতির চরম অস্তিত্বসংকট ও মুক্তির আকুতি একজন দেশপ্রেমিক নেতার চারপাশে পুঞ্জীভূত হয়ে নতুন এক জাতীয়তাবাদী ও সার্বভৌম ধারার জন্ম দিয়েছিল।

সেই ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমি বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ১৯৭৫ সালের ৩ থেকে ৬ নভেম্বরের সেই শ্বাসরুদ্ধকর দিনগুলোতে। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট এক মর্মান্তিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারের অভ্যন্তরে নানামুখী চক্রান্ত চলতে থাকে। তারাই ধারাবাহিকতায় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এক আকস্মিক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসে গৃহবন্দি করেন। খালেদ মোশাররফ নিজে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই আকস্মিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতার পালাবদল দেশের সাধারণ সিপাহী এবং রাজনৈতিক পরিমন্ডলে চরম সংশয়, আতঙ্ক ও গভীর অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করে। এই নৈরাজ্যকর অবস্থা বহিঃশক্তির নানামুখী গভীর চক্রান্ত ও সাংবিধানিক শূন্যতা দেশকে এক ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। চারদিকের থমথমে পরিস্থিতিতে সেনাসদস্যদের একাংশের মধ্যে বিভ্রান্তি ও পাল্টা উত্তেজনার জন্ম নেয়।

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চিরতরে বিপন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহিরা এক ঐতিহাসিক ও সাহসী প্রতিরোধে ফেটে পড়েন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, এই গভীর খাদ থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে হলে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করাই একমাত্র পথ।

জেনারেল খালেদ মোশাররফ রক্তপাতহীন ক্যু করতে গিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করেন ৩রা নভেম্বর। কর্নেল (অব.) আবু তাহের সে সময় নারায়ণগঞ্জ অবস্থান করছিলেন। কর্নেল তাহের ছিলেন জিয়াউর রহমানের একজন বিশেষ শুভাকাঙ্ক্ষী। জিয়া তার বাসভবনে বন্দী হয়ে থাকেন। খালেদ মোশারফের নির্দেশে তাকে বন্দী করে রাখেন তরুণ ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ। জিয়ার বাসার টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু ক্যাপ্টেন হাফিজুল্লাহ একটি ভুল করেন। তিনি ভুলে যান বেডরুমেও একটি টেলিফোন আছে। জিয়া কৌশলে বেডরুম থেকে ফোন করেন তাহেরকে। খুব সংক্ষেপে বলেন “সেভ মাই লাইফ”।

৭ নভেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের সিপাহিদের বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং সাধারণ মানুষের বাঁধভাঙা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন। এই কারামুক্তি কেবল একজন ব্যক্তির শারীরিক মুক্তি ছিল না; এটি ছিল একটি মুমূর্ষু জাতির পুনর্জাগরণ ও আত্মমর্যাদার নবজন্ম। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েই জিয়াউর রহমান যে অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তিনি ক্ষমতা আকস্মিকভাবে দখল করার সংকীর্ণ মানসিকতায় না ভেবে বরং জনগণের ঐক্য ও আস্থাকেই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

সিপাহী-জনতার এই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান প্রাণশক্তি ছিল সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহিদের (লোয়ার র‍্যাংকড সোলজার্স) অতুলনীয় দেশপ্রেম ও শৃঙ্খলার অনন্য মেলবন্ধন। সামরিক কাঠামোর কঠোর নিয়মে সিপাহিরা সবসময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মানতে বাধ্য থাকেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের সিপাহিরা নিজেদের পেশাগত গন্ডি পেরিয়ে যে ঐতিহাসিক দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। তৎকালীন সময়ে সেনানিবাসের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের গভীর ষড়যন্ত্র, উসকানি ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছিল। কিন্তু সাধারণ সিপাহিরা দূরদর্শিতা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি বিদেশি মদদপুষ্ট চক্র বা অভ্যন্তরীণ চক্রান্ত দেশের স্বাধীনতাকে চিরতরে গ্রাস করতে চায়। এই সংকটময় মুহূর্তে তাঁরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নেমে আসেন কেবল নিজেদের দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সঠিক নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসার জন্য। সিপাহিদের এই ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ জনকল্যাণমুখী, নিঃস্বার্থ ও দেশপ্রেমের পরম নিদর্শন, যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না।

এই ঐতিহাসিক বিপ্লবের সবচেয়ে বড় রূপ ও সৌন্দর্য প্রকাশ পেয়েছিল ‘সিপাহী’ এবং ‘জনতা’-র পারস্পরিক অবিচ্ছেদ্য সংহতিতে। ইতিহাসের বহু বিপ্লবে সেনাবাহিনী এবং সাধারণ জনগণের দূরত্ব বা সংঘাতের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস রয়েছে, যেখানে সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ৭ নভেম্বর ঢাকা এবং এর আশপাশের প্রতিটি রাজপথে রচিত হয়েছিল এক অভূতপূর্ব ও হৃদয়গ্রাহী দৃশ্যপট। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, রিকশাচালক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সিপাহিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। মানুষের কণ্ঠে তখন ধ্বনিত হচ্ছিল প্রাণোচ্ছল স্লোগান—“সিপাহী-জনতা ভাই ভাই, জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ”, অথবা “জাতীয় পতাকা সমুন্নত রাখো”, “স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করো”। সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের ঘরের তৈরি খাবার ও পানি সিপাহিদের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাঁদের আলিঙ্গন করেছেন এবং একে অপরকে চরম দুঃসময়ে সাহস জুগিয়েছেন। জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও আবেগঘন অংশগ্রহণ সেদিন বিশ্ববাসীকে প্রমাণ করেছিল যে, এ দেশের মানুষ কোনো রক্তপাত বা সংঘাত চায় না; তারা চায় একটি শক্তিশালী, সৎ এবং দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব। এই ঐক্য প্রমাণ করে যে, ৭ নভেম্বর কোনো ক্ষমতার লোভী অভ্যুত্থান ছিল না, বরং এটি ছিল একটি জনসমুদ্রের বিস্ফোরণ, যা দেশের স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দিয়েছিল।

এই অভ্যুত্থানের পরবর্তী রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন এবং এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক ফলাফল বাংলাদেশের ভাগ্য চিরতরে বদলে দিয়েছিল। জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার পর থেকেই বাংলাদেশ একটি নতুন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক রূপরেখা লাভ করে। দীর্ঘদিনের একদলীয় শাসনব্যবস্থার নাগপাশ থেকে দেশকে মুক্ত করে জিয়াউর রহমান প্রবর্তন করেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের, যার ফলে দেশের সব রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ পায়।

সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য ডাক দেন ‘উৎপাদনমুখী রাজনীতি’র। গ্রামবাংলার অবহেলিত কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী করার জন্য ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচি এবং সবুজ বিপ্লবের সূচনা করা হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব জোয়ার এনেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গন ও কূটনীতির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান অত্যন্ত সফলভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রেখে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিশেষ করে, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতীক ‘সার্ক’ (SAARC)-এর ধারণা প্রবর্তন করে তিনি আঞ্চলিক কূটনীতি ও শান্তির ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

জিয়াউর রহমান হলেন পৃথিবীর সেই একমাত্র ও অনন্য সৌভাগ্যবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর পেছনে একটি পুরো জাতি এবং সিপাহী সমাজ নিজেদের নিঃশর্ত ভালোবাসা, আস্থা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। ৭ নভেম্বর কেবল ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ বা ক্ষমতার পালাবদলের কোনো সাধারণ দিন নয়; এটি হলো একটি জাতির আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা রক্ষা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিপ্রস্তর। সুতরাং আজকের পরিবর্তনশীল বিশ্বরাজনীতি এবং জটিল ভূকৌশলগত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের শাশ্বত আদর্শ—জাতীয় ঐক্য, সিপাহী-জনতার অবিচ্ছেদ্য সংহতি এবং নিখাদ দেশপ্রেম—আমাদের জাতীয় জীবনে চিরকাল একটি অবিনাশী আলোকবর্তিকা ও প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে । 


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: