উদ্বৃত্ত আলুর বহুমুখী ব্যবহার, আমদানিনির্ভরতা কমানো ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আলু থেকে স্টার্চ পাউডার উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ স্টার্চ পাউডার বিদেশে রপ্তানি করা হবে। ফলে দেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এ পাউডার বিভিন্ন খাদ্যপণ্য কাগজ ওষুধ ও রাসায়নিক শিল্পে ব্যাপক ব্যবহৃত হচ্ছে। শিগগিরই উত্তরাঞ্চলে স্টার্চ পাউডার তৈরির জন্য ৮ থেকে ১০টি কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া, বগুড়া বিমানবন্দর চালু করে সেখান থেকে আলু ও সবজি সরাসরি বিদেশে রপ্তানিরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে আলুচাষিরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে দেশে নতুন শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ তৈরি হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদিত হয়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। এতে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে লোকসানে পড়ছেন কৃষকরা। বিশেষ করে মৌসুম শেষে হিমাগারে অবিক্রিত আলু নিয়ে তৈরি হয় সংকট। এমন পরিস্থিতিতে আলুকে শুধু সবজি হিসেবে নয়, শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক কৃষিপ্রযুক্তিবিষয়ক আলোচনায় উত্তরাঞ্চলের উদ্বৃত্ত আলুর অর্থনৈতিক ব্যবহার বাড়াতে স্টার্চ পাউডার উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদেশ থেকে স্টার্চ আমদানির চাপ কমবে এবং দেশীয় শিল্পের জন্য বিকল্প কাঁচামালের জোগান তৈরি হবে।
স্টার্চ পাউডারের বহুমুখী ব্যবহার : আলু থেকে উৎপাদিত স্টার্চ পাউডার খাদ্যশিল্প, বস্ত্রশিল্প, কাগজ, ওষুধ ও রাসায়নিক শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া, বিস্কুট, নুডলস, চিপস, ক্যান্ডি, ক্যাপসুল, আঠা ও বিভিন্ন শিল্পপণ্য তৈরিতেও এর ব্যবহার রয়েছে। বর্তমানে এসব শিল্পের কাঁচামালের একটি অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। দেশেই মানসম্মত স্টার্চ উৎপাদন করা গেলে আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগও তৈরি হবে।
উত্তরাঞ্চলে আলুতে সম্ভাবনা : দেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, জয়পুরহাট ও ঠাকুরগাঁও এলাকায় ব্যাপক আলু উৎপাদিত হচ্ছে। এসব অঞ্চলে স্টার্চ উৎপাদন কারখানা স্থাপন করা হলে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি আলু সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে পরিবহন ব্যয় কমানো এবং উৎপাদিত আলুর স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে : আলু থেকে বাণিজ্যিকভাবে স্টার্চ উৎপাদন খুব একটি সহজ কাজ নয়। এ ক্ষেত্রে আলুর শুষ্ক পদার্থ ও স্টার্চের পরিমাণ, উন্নত জাত নির্বাচন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ এবং উৎপাদন খরচ নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপযুক্ত জাত নির্বাচন ও গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমানো না গেলে শিল্পটি প্রতিযোগিতামূলক করা কঠিন হবে। এ ছাড়া সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান এবং কৃষকদের সঙ্গে কারখানার সরাসরি চুক্তিভিত্তিক আলু সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তাহলে এটি আলোর মুখ দেখবে।
বিদেশের বাজারে রপ্তানির সম্ভাবনা : দেশের উদ্বৃত্ত আলু কাজে লাগিয়ে স্টার্চ পাউডার উৎপাদন এবং তা বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে কৃষি ও শিল্প খাতে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে আলুর স্টার্চের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে আলুচাষিরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে দেশে নতুন শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ তৈরি হবে। পাশাপাশি বগুড়া বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কার্গো সুবিধাসম্পন্ন করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য রপ্তানিতে সহায়ক হবে।
কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রত্যাশা : আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের জন্য সারা বছর আলু বিক্রির বাজার তৈরি হবে। এতে তারা ভ্যাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ পাবে। ফলে তাদের আলু চাষে আরো আগ্রহ বাড়বে। তবে কারখানায় আলু সরবরাহের নিশ্চয়তা, ন্যায্যমূল্য, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে আলু থেকে স্টার্চ উৎপাদন শিল্প গড়ে তোলা গেলে দেশে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের নতুন দুয়ার খুলতে পারে। তবে শুধু উদ্যোগ ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বড় বিষয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, উদ্বৃত্ত আলু কাজে লাগিয়ে স্টার্চ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শিগিরই উত্তরাঞ্চলে ৮ থেকে ১০ টি কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু হবে। স্টার্চ পাউডার উৎপাদনের পর আমরা তা বিদেশে রপ্তানি করব। এতে কৃষকদের আলু চাষে আর লোকসান গুনতে হবে না। এ উদ্যোগ সফল হলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এছাড়া, কৃষির আধুনিকায়ন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানো এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি জানান।