রাজধানীর যানজট নিরসনে আরও দুটি মেট্রোরেল নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। এই দুটিতে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে পাতাল রেল। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে দুটি পাতাল রেলপথ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে মেট্রোরেল বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানী লিমিটেড। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পের অবকাঠামো উন্নয়ন চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা যায়, রাজধানীর গণপরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণে আরও এক ধাপ এগিয়েছে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১। এরই মধ্যে মেট্রোরেল পাতালপথ প্রকল্পের চারটি গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্রাক্ট প্যাকেজের নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এসব চুক্তির আওতায় টানেল ও স্টেশন নির্মাণ, ট্র্যাক ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপন, সিগন্যালিং, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের প্রস্তুতিও চূড়ান্ত পর্যায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রথম এই পাতাল মেট্রোরেলের কাজ আগামী ডিসেম্বরে পুরোদমে শুরু হতে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এমআরটি-১-এর প্রাথমিক সব কাজ গুছিয়ে এনেছেন তারা। এ মাসের শেষের দিকে অথবা ডিসেম্বরের শুরুর দিকে কাজের সূচনাও করতে চায়।
সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, চারটি মেট্রোরেলের মধ্যে তিনটির অর্ধেক বা তারও বেশি হবে পাতাল রেল। এর মধ্যে ২০২৭ সালে শেষ হবে দ্বিতীয়টি তথা এমআরটি লাইন-১। এর দুটি অংশ রয়েছে। একটি অংশ বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত, যমুনা ফিউচার পার্ক, নতুনবাজার, উত্তর বাড্ডা, বাড্ডা, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত যাবে। এ অংশের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৬ দশমিক ২১ কিলোমিটার হবে মাটির নিচ দিয়ে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম পাতাল রেল। বাকি তিন দশমিক ৬৬ কিলোমিটার হবে উড়ালপথে (এলিভেটেড)। এ অংশে ১২টি স্টেশন থাকবে, যার সবগুলোই হবে মাটির নিচে। এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, রাজধানীর যানজট নিরসন, যাতায়াতের সময় কমানো এবং নাগরিকদের জন্য আধুনিক ও মানসম্মত গণপরিবহন সেবা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য অর্জনে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণসহ নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও সময়োপযোগী নগর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপান সরকারের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা ও জাইকার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। এছাড়াও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে সচিব বলেন, প্রকল্পের কাজ সময়মতো সম্পন্ন করতে হবে, যাতে নির্মাণকাজের কারণে সাধারণ মানুষের যে সাময়িক ভোগান্তি সৃষ্টি হবে, তা দীর্ঘায়িত না হয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঢাকাবাসীর জন্য পাতাল মেট্রোরেল কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৪ টানেল ও স্টেশন নির্মাণ প্যাকেজের আওতায় এমআরটি লাইন-১-এর রামপুরা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে নতুন বাজার স্টেশন পর্যন্ত মোট ৪ দশমিক ৪৪৭ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড রুট নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটির ২য় ধাপে, কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৬ টানেল ও স্টেশন নির্মাণের আওতায় এমআরটি লাইন-১-এর নদ্দা আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে এয়ারপোর্ট স্টেশন পর্যন্ত মোট ৫ দশমিক ১৮২ কিলোমিটার আন্ডারগ্রাউন্ড রুট নির্মাণ করা হবে।
এছাড়াও প্রকল্পটির ৩য় ধাপে, কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-০৯ (ট্র্যাক ও ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেমের আওতায় এমআরটি লাইন-১-এর ট্র্যাক ওয়ার্কস (রেল, টার্নআউট, পয়েন্ট ও ক্রসিং ইত্যাদি) এবং ইলেকট্রিক্যাল ফ্যাসিলিটি স্থাপন করা হবে। কন্ট্রাক্ট প্যাকেজ সিপি-১০ (সিগন্যালিং, টেলিকমিউনিকেশন, প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর ও এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় এমআরটি লাইন-১ এর সিগন্যালিং সিস্টেমে প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর এবং এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ইআরএমএস) স্থাপন করা হবে। তথ্যমতে, মোট চারটি প্যাকেজের নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাজধানীর গণপরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হবে। একইসঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান যাতায়াত চাহিদা মোকাবিলা, যানজটের চাপ কমানো এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও এগিয়ে যাবে।
সূত্র জানায়, ঢাকায় পাতাল রেল হবে সড়কের ১৫০ থেকে ২০০ ফুট নিচে। আর স্টেশনগুলোর আকার হবে কয়েক হাজার বর্গফুট ও তিন-চার তলাবিশিষ্ট। এতে পাতাল রেলের টানেল ও স্টেশন থেকে প্রচুর মাটি অপসারণ করতে হবে। ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় এত পরিমাণ মাটি ফেলার মতো পর্যাপ্ত নিচু জমি নেই। কিছু স্থানে নিচুজমি বা খাল থাকলেও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সেখানে মাটি ফেলা সম্ভব নয়। তাই মেট্রোরেলের মাটি ফেলার জন্য একাধিক বিকল্প নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মাটি ফেলার জন্য সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের জন্য নিচু জমি ভরাটে প্রচুর বালি ও মাটি দরকার হবে। এক্ষেত্রে আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেলের মাটি সরবরাহ করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। এজন্য আবাসন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এমএমএন ছিদ্দীক বলেন, পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি-১-এর প্রায় সব কাজ আমরা গুছিয়ে এনেছি। আমরা চেষ্টা করছি- মাটি খনন করার টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) আমাদের এখানেই প্রস্তুত করার। তাহলে আমাদের নিজেদের ক্যাপাবিলিটি বাড়বে। এই কাজটি কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত মাটির নিচে ৩০ মিটার আবার কোথাও কোথাও ৭০ মিটার নিচে করা হবে। এই খননকাজ করার সময় জনসাধারণের চলাচলে কোনো অসুবিধা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমটিসিএলের এমডি বলেন, ‘টিবিএম মেশিন যখন মাটির নিচে কাজ করবে, তখন রাস্তার ওপর বোঝা যাবে না যে মাটির নিচে কাজ হচ্ছে। সমস্যা একটু হবে স্টেশন নির্মাণের সময়।’