দেশের সব কারাগারে নিরাপত্তা জোরদার, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দায়িত্ব পালনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাত দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছে কারা অধিদপ্তর। এসব নির্দেশনার আওতায় লকআপের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি, দায়িত্বে অননুমোদিত অনুপস্থিতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং আকস্মিক পরিদর্শনসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, শৃঙ্খলাভঙ্গ এবং প্রচলিত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণে কারাগারে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এসব অনিয়ম সংশোধনাগারগুলোর সার্বিক ব্যবস্থাপনাকে ব্যাহত করতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকেই নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে কঠোরতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল মেসবাহুল আলম সেলিম জানান, নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি কারাগারে প্রতিদিন তদারকি চলছে। পাশাপাশি সব কারাগারকে নিয়মিতভাবে অধিদপ্তরের কাছে অগ্রগতি ও মতামত জানাতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কি না, তা দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অধিদপ্তরের অপারেশনাল শাখাকে। এ ছাড়া ডেপুটি জেলারসহ অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁদের দেশের বিভিন্ন কারাগার পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হবে।
কর্নেল মেসবাহুল আলম সেলিমের দাবি, সাত দফা নির্দেশনার অন্তত ৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে এসব উদ্যোগের সুফল দৃশ্যমান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। দায়িত্ব পালনে অবহেলার দায়ে অভিযুক্ত কারা কর্মীদের এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে বদলির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া লকআপের পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। জরুরি প্রয়োজনে ব্যতিক্রমী কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে জেলারের লিখিত অনুমোদন নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট রেজিস্টারে বিস্তারিত তথ্য লিপিবদ্ধ করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
প্রতিটি কারাগারে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্ভব হলে এ জন্য আলাদা পর্যবেক্ষণ কক্ষ স্থাপন করতে হবে। সেখানে প্রশিক্ষিত ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ কারারক্ষীদের দায়িত্ব দিতে হবে। পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা না থাকলে উপযুক্ত স্থানে মনিটর বসিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালু রাখতে হবে।
নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কোনো প্রহরী বা পাহারাদার কর্মী অনুমতি ছাড়া নির্ধারিত স্থান ত্যাগ করলে তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত প্রতিবেদন দিতে হবে। এ ধরনের ঘটনায় প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। দায়িত্বে অননুমোদিত অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে শূন্য-সহনশীলতার নীতি অনুসরণের কথাও জানিয়েছেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক।
নির্দেশনা অনুযায়ী, দায়িত্বে অবহেলা বা অনুপস্থিতির ঘটনা গোপন করা, প্রতিবেদন দিতে বিলম্ব করা কিংবা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
বারবার দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠা পাহারাদার কর্মীদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ও উৎসাহমূলক কার্যক্রমের আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে। পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায় তাঁদের বদলি করা হতে পারে। পাশাপাশি প্রচলিত বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে।
বৃষ্টি, বজ্রপাতসহ প্রতিকূল আবহাওয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রহরীদের নির্ধারিত স্থানে অবস্থান এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হবে।
এ ছাড়া কারাগারের সুপারিনটেনডেন্ট, জেলার ও অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি এবং আকস্মিক পরিদর্শন করতে বলা হয়েছে। পরিদর্শনের সময় নিরাপত্তা চৌকি, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, প্রহরীদের দায়িত্ব পালন এবং সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষা করতে হবে। কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
গত আগস্টে জারি করা সাত দফা নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, কারাগারের ভেতরে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুরো কারা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
কারাগারের নিরাপত্তা ঘাটতি দূর করা, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এসব নির্দেশনা দ্রুত বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে কারা অধিদপ্তর।