নারী উন্নয়নের মূর্ত প্রতীক খালেদা জিয়া

মতামত

১৯৮০-এর দশকের সূচনালগ্নে, যখন সামরিক শাসনের কঠোর বাস্তবতায় মানুষের বাক্‌স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতার চেতনা সংকটাপন্ন, ঠিক সেই প্রতিকূল

2026-11-04T16:48:39+00:00
2026-11-04T16:50:18+00:00
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
 
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
মতামত
নারী উন্নয়নের মূর্ত প্রতীক খালেদা জিয়া
-কাজী ছাব্বীর
বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:৪৮ পিএম  আপডেট: ০৪.১১.২০২৬ ৪:৫০ পিএম
নারী উন্নয়নের মূর্ত প্রতীক খালেদা জিয়া

১৯৮০-এর দশকের সূচনালগ্নে, যখন সামরিক শাসনের কঠোর বাস্তবতায় মানুষের বাক্‌স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতার চেতনা সংকটাপন্ন, ঠিক সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক অঙ্গনে আত্মপ্রকাশ করেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বের প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে সময় খালেদা জিয়ার সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার ব্যক্তিগত ইচ্ছা না থাকলেও দলের অস্তিত্ব রক্ষা, সাংগঠনিক ঐক্য অটুট রাখা এবং বিএনপিকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচানোর তাগিদে জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনুরোধ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে ধীরে ধীরে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে তিনি নীরবে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণ করেন। এরপর দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা ক্রমশ সুদৃঢ় হয়। দলের সংকটময় মুহূর্তে নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি বিএনপির ঐক্য ও সাংগঠনিক ভিত্তি অটুট রাখেন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিক ও সুদৃঢ় ভিত্তি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় অবস্থান, সাহসী নেতৃত্ব ও আপসহীন ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরও তাঁকে নানা সংশয় ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মতো জটিল ও গুরুদায়িত্ব পালনে তিনি কতটা সক্ষম হবেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার দৃঢ়তা দিয়ে তিনি নিজের নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রমাণ করেন। সংশয় ও সমালোচনার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি প্রমাণ করেন, রাজনীতিতে তাঁর উত্থান কেবল পারিবারিক পরিচয়ের অনিবার্য পরিণতি নয়; বরং সংকটের মুখে দায়িত্ব গ্রহণ, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় রাজনীতিতে নিজস্ব অবস্থান তৈরির এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৯৩ সালে তিনি সার্কের প্রথম নারী চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক কূটনীতিতে তাঁর নেতৃত্বকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরে।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও আপসহীন অবস্থান

১৯৮৬ সালে স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর বিতর্কের সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলেও বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট—গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করে কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনকে প্রাধান্য দিয়ে রাজপথের সংগ্রাম বেছে নেন।

প্রায় দুই দশক পর, ২০০৭ সালে এক-এগারোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়ও দেশ ও জাতির প্রশ্নে তাঁর আপসহীন মনোভাবের আরেকটি দৃষ্টান্ত দেখা যায়। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে পরিকল্পিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র মাধ্যমে দেশের প্রধান দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও তিনি দৃঢ় অবস্থান নেন। শেখ হাসিনা সম্মতি দিলেও খালেদা জিয়া দেশত্যাগের চাপ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও দেশ ছাড়েননি। তাঁর এই অনমনীয় অবস্থান দেশের মানুষের কাছে দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতীক হয়ে ওঠে।

দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার পর তিনি স্থায়ীভাবে বিদেশে থেকে যাওয়ার পরিবর্তে দেশে ফিরে আসেন। এখানেও তিনি দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। একজন রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে যেমন, একজন মা হিসেবেও বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল গভীর বেদনা ও কঠিন পরীক্ষায় পরিপূর্ণ। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অসুস্থতার সময় তাঁর পাশে থাকতে না পারার বেদনা এবং পরবর্তী সময়ে সন্তানের মৃত্যু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়গুলোর অন্যতম। অন্যদিকে, বড় ছেলে তারেক রহমানকে দীর্ঘদিন লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হয়েছে। তবুও বেগম খালেদা জিয়া তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে দাঁড়াননি। ব্যক্তিগত শোক, দুই সন্তানকে কাছে না পাওয়ার বেদনা, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দেশের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় রেখেছেন। বাংলাদেশের নারী নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অবস্থান, সাহসিকতা এবং প্রতিকূলতার মুখে অবিচল থাকার ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

নারী ক্ষমতায়নে জিয়াউর রহমানের ভিত্তি স্থাপন ও খালেদা জিয়ার অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশে নারী ক্ষমতায়নের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর শাসনামলে মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, সরকারি চাকরি ও শিক্ষায় নারীদের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং পুলিশ ও স্থানীয় সরকার কাঠামোয় নারীদের অংশগ্রহণের পথ সুগম করার মতো উদ্যোগ নারীসমাজকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে নারী উন্নয়নের সেই ধারাকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেন। তাঁর সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সুরক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের উন্নয়নের সুযোগ সম্প্রসারণে তাঁর সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ জাতীয় পর্যায়ে নারী উন্নয়নের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।

নারীশিক্ষা প্রসারে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি কর্মসূচির সম্প্রসারণ। ১৯৯৪ সালে চালু হওয়া ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম গ্রামীণ মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের উপবৃত্তি ও শিক্ষা সহায়তা দেওয়ার ফলে বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নারীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার ক্ষেত্রেও খালেদা জিয়ার সরকারের ‘ফুড ফর এডুকেশন’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা ও বৃত্তি কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। এসব উদ্যোগ নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যাবিষয়ক খাতভিত্তিক কর্মসূচির মাধ্যমে মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর পুষ্টি এবং পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নারীর মর্যাদা, অধিকার ও নারী জাগরণের প্রতীক বেগম রোকেয়ার অবদানকে জাতীয় পর্যায়ে স্মরণীয় করে রাখার ক্ষেত্রেও বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের উদ্যোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯৫ সালে বেগম রোকেয়া পদক প্রবর্তনের মাধ্যমে নারীশিক্ষা, নারী জাগরণ ও সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখা নারীদের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র তৈরি হয়।

জাতীয় রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৩০ থেকে ৪৫-এ উন্নীত করা হয়। এর ফলে জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ে। নারীর নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনগত উদ্যোগ নেওয়া হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, যৌতুকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অ্যাসিড-সন্ত্রাসের মতো অপরাধ দমনে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নারীর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে।

নারী উন্নয়নের মূর্ত প্রতীক বেগম খালেদা জিয়া

নারীর শিক্ষা, ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সরকারের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, নারীশিক্ষায় উৎসাহ প্রদান এবং প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতের উন্নয়ন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন উদ্যোগ নারী উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে সেনা, নৌ ও পুলিশ বাহিনীসহ বিভিন্ন পেশায় নারীদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টিও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়নকে কেবল শিক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের সর্বস্তরে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তিনি তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। স্থানীয় সরকার, জাতীয় সংসদ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে নারীদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি বাংলাদেশের নারীসমাজের অগ্রযাত্রারই প্রতিফলন। আজ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অসংখ্য কিশোরীর উপস্থিতি, কর্মক্ষেত্রে নারীদের আত্মবিশ্বাসী পদচারণ এবং নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণ নারী উন্নয়নের দীর্ঘ সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

নারীর শিক্ষা, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের নারী নেতৃত্বের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০০৫ সালে ফোর্বস সাময়িকীর বিশ্বের প্রভাবশালী নারীদের তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতির আলোচনায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রতিকূলতার প্রাচীর পেরিয়ে আপসহীন নেতৃত্ব

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ একটি অধ্যায়জুড়ে রয়েছে স্বামী ও সন্তান হারানোর বেদনা, মামলা, কারাবাস, রাজনৈতিক চাপ এবং বহুমাত্রিক প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তাঁর রাজনৈতিক জীবন গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় তাঁর কারাদণ্ড ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকা এবং পরবর্তী সময়ে গৃহবন্দিত্বসদৃশ বিধিনিষেধের মধ্যে জীবনযাপন তাঁর স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সীমিত করে দেয়। একই সঙ্গে তাঁর শারীরিক অসুস্থতা, চিকিৎসার সুযোগ এবং বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণে বাধা দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে।

বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও বেগম খালেদা জিয়া তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। এ কারণে তিনি দেশে-বিদেশে আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

গণ-আন্দোলন, ক্ষমতার পতন ও ইতিহাসের শিক্ষা

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ব্যাপক গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে চলে যান।

বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা, জনসমর্থন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ সৃষ্টি করেছে। ইতিহাস বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যতই শক্তিশালী হোক, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করে টিকে থাকা যায় না।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার জীবনসংগ্রাম ও নেতৃত্বের মূল্যায়ন দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, নারী নেতৃত্বের বিকাশ এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও সংসদীয় নেতৃত্বের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ইতিহাসের নির্মোহ মূল্যায়নে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিংবা একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান নন; তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, নারী নেতৃত্বের বিকাশ এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ক্ষমতার পালাবদলে ইতিহাসের অধ্যায় বদলায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া নেতৃত্বের অবদান সময়ের সীমানা পেরিয়ে আলোচিত হয়। সেই বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক বিবর্তনের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকার ভবিষ্যতেও ইতিহাসের বিচার ও গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে।

লেখক: কবি, ঔপন্যাসিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক কর্মী।



Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: