প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার চেয়ে একজন শিশুর জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা অনেক বড়। ধর্মীয় পরিচয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক কিংবা সামাজিক সম্মানের আড়ালে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার অভিযোগ চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে শৈশব নিরাপদ হবে না। ২০২৬ সালের একের পর এক ঘটনা ও পরিসংখ্যান আমাদের সেই নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।
শিশু কখনো মুরুব্বির কোলে উঠে কান্না করে। সে মুরুব্বির কোলে থাকতে চায় না। মা বকা দিয়ে বলেন, ‘এই পাজি মেয়ে, অমন করতেছ ক্যান? উনি তোমার নানা হন। নানা তোমাকে কত আদর করেন। কতকিছু গিফট দেন।’
এরপর নানা বাসায় এলে শিশু লুকিয়ে পড়ে, কিংবা সে অসুস্থ বোধ করে অথবা ওয়াশরুমে গিয়ে বসে থাকে। মা-বাবা বুঝতেই চান না শিশু কেন ওই মুরুব্বির কাছে যেতে চাইছে না। তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে মুরুব্বির সম্মান, আত্মীয়তার সম্পর্ক আর উপহার দেওয়ার হিসাব। শিশুর অস্বস্তিকে তারা অবাধ্যতা মনে করেন। অথচ শিশুর আচরণের পেছনে ভয়, অস্বস্তি কিংবা কোনো খারাপ অভিজ্ঞতা আছে কিনা, সেটা জানার চেষ্টা করেন না।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির কাছে যেতে না চাওয়া নিজে থেকে যৌন নির্যাতনের প্রমাণ নয়। কিন্তু শিশুর আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন, নির্দিষ্ট কারও উপস্থিতিতে আতঙ্ক, অস্বাভাবিক নীরবতা কিংবা বারবার এড়িয়ে চলার প্রবণতাকে অবহেলা করাও বিপজ্জনক। শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অভিভাবকের দায়িত্ব।
শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে মুরুব্বির সম্মান বড় হয়ে উঠলে সেই পরিবারে শিশুর বিপদ জানানোর পথই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
পরিচিত মানুষের হাতে বিপন্ন শৈশব
শিশু সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার কাজে গিয়ে শুনেছি, বহু নারী-পুরুষ শৈশব কিংবা কৈশোরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মামাতো, চাচাতো, ফুপাতো ভাই, দুলাভাই, চাচা, মামা, খালু, দাদা, নানা, প্রতিবেশী, পুলিশ, রাখাল, দোকানদার, পাড়ার বড় ভাই, মুরুব্বি, শিক্ষক, হুজুর- এমন এক বা একাধিক ব্যক্তির হাতে নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে।
এটা আমার প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় শোনা অভিজ্ঞতার বিবরণ, দেশের সব নারী-পুরুষের ওপর পরিচালিত কোনো প্রতিনিধিত্বশীল জরিপের ফল নয়। তবু এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে: শিশুর জন্য বিপদ সব সময় অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসে না। কখনো পরিবার, আত্মীয়তা, সামাজিক পরিচিতি কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই শিশুর বিশ্বাস ভেঙে যায়।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশু অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে না। কখনো তাকে ভয় দেখানো হয়, কখনো উপহার দিয়ে প্রলুব্ধ করা হয়, কখনো বলা হয় কাউকে জানালে শাস্তি পেতে হবে। আবার কখনো পরিবারই তাকে চুপ করিয়ে দেয়- পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে, মানুষ কী বলবে, মুরুব্বির নামে এমন অভিযোগ তোলা যায় না। এভাবে অপরাধীর সুবিধা হয়, আর শিশুকে বহন করতে হয় ভয় ও অপরাধবোধের বোঝা।
প্রথম ফল হুজুরকে দেওয়া: শ্রদ্ধা যখন অন্ধ বিশ্বাস
আমাদের সমাজে ধর্মীয় শিক্ষকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা আছে। সেই আস্থার একটি পরিচিত প্রকাশ হলো বাড়ির গাছের প্রথম ফল হুজুরকে দেওয়া। গাছে প্রথম পেয়ারা, আনার, পেঁপে কিংবা লাউ ধরলে তা শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে হুজুরকে দেওয়া হয়। এটা নিছক ফল উপহার দেওয়ার বিষয় নয়। এর মধ্যে থাকে ধর্মীয় শিক্ষকের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, সম্মান ও কৃতজ্ঞতা।
এই সামাজিক রীতিতে কোনো অন্যায় নেই। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন শ্রদ্ধা অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত হয়। যখন অভিভাবক ধরে নেন, ধর্মীয় শিক্ষক কখনো অনৈতিক কাজ করতে পারেন না। তখন তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই শিশুকে অবিশ্বাস করা হয়। শিশুকে যার হাতে নিরাপদ মনে করে তুলে দেওয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠান বা পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে যদি সত্য অনুসন্ধান বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে সেই বিশ্বাস শিশুর নিরাপত্তার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
আমার শোনা অভিজ্ঞতার মধ্যে এমন একটি বিবরণ আছে, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষককে ব্যভিচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলতে শুনে এক শিক্ষার্থী তাকে সেই ধর্মীয় শিক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল। জবাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি বলেছিল, ‘চিন্তা করিস না। এত আস্তে দেব যে আল্লাহর আরশ টেরও পাবে না।’
এমন বক্তব্যের মর্মার্থ ভয়াবহ। ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে শিশুকে নৈতিকতার পথে পরিচালিত করার কথা, অথচ সেই ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করেই যদি কেউ শিশুর বিশ্বাস ভাঙে, তবে তা শুধু শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ নয়, ধর্মীয় শিক্ষারও চরম অবমাননা।
২০২৬ সালের পরিসংখ্যান: ছেলে শিশুরাও ভয়াবহ ঝুঁকিতে
২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার বিষয়ে JusticeMakers Bangladesh in France (JMBF) একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি বাংলাদেশের ৮২টি জাতীয়, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই নয় মাসে ১৭১ জন ছেলে শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬১ জন ধর্ষণের শিকার এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার বলে নথিভুক্ত। এসব ঘটনায় ১৫৬ জন অভিযুক্তের তথ্য পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭৭ জন শিশু বারবার অথবা দীর্ঘ সময় ধরে ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, মাদ্রাসায় ১২২ জন শিক্ষার্থী যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪০ জন শিক্ষার্থীর আক্রান্ত হওয়ার তথ্য আছে। মাদ্রাসায় ৮১ জন শিক্ষককে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে শিশুদের আলাদা কক্ষে নিয়ে যাওয়া, খাবার বা টাকা দেওয়ার প্রলোভন, প্রাণনাশের হুমকি, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো এবং অভিযোগ জানানোর পরও কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার মতো অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও পরিবারকে নীরব থাকতে বলা কিংবা অনানুষ্ঠানিক সালিশের মাধ্যমে ঘটনা মীমাংসার চেষ্টার অভিযোগও আছে।
এগুলো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা থেকে তৈরি পর্যবেক্ষণ। দেশের সব মাদ্রাসা কিংবা সব ধর্মীয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো সাধারণ সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু এসব অভিযোগের ব্যাপ্তি এবং ঘটনার ধরন মাদ্রাসার শিশু সুরক্ষা, স্বাধীন অভিযোগব্যবস্থা ও কার্যকর তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলার জন্য যথেষ্ট।
অক্টোবরেও একই ভয়াবহতার খবর
২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর দ্য ডেইলি স্টার জানায়, গাজীপুরের একটি আবাসিক কওমি মাদ্রাসায় আট বছর বয়সী এক ছেলে শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে একজন শিক্ষক এবং পরিচালনা কমিটির একজন সদস্যকে আদালত কারাগারে পাঠিয়েছেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, শিক্ষক শিশুকে রাতে ঘুম থেকে ডেকে মাদ্রাসার একটি স্টোররুমে নিয়ে যায় এবং ১০, ১১ ও ১২ অক্টোবর পরপর তিন রাতে নির্যাতন করেনবলে অভিযোগ করা হয়েছে। শিশুকে ঘটনা প্রকাশ না করতে ভয় দেখানোর অভিযোগও আছে।
এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকার সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক ছেলে শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে চার শিক্ষক ও ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। শিশুর বাবার অভিযোগ অনুযায়ী, নির্যাতন শুরু হওয়ার পর সে শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ করলেও তাকে সুরক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে আরও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
এগুলো অভিযোগের ভিত্তিতে চলমান মামলার বিবরণ। আদালতে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধের তালিকা নয়। কিন্তু পরপর এমন ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার পরও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন না তোলার সুযোগ কোথায়?
আবাসিক মাদ্রাসায় শিশু পরিবার থেকে দূরে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের ওপর তার দৈনন্দিন জীবন, ঘুম, পড়াশোনা ও চলাফেরার নিয়ন্ত্রণ থাকে। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পথ না থাকলে কিংবা অভিযোগের পরও অভিযুক্তের প্রভাব বজায় থাকলে শিশু দীর্ঘ সময় নির্যাতনের শিকার হতে পারে। তাই শুধু অপরাধীকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং অভিযোগ পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ কী করেছে, সেটাও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
মাদ্রাসা নয়, জবাবদিহিহীনতাই মূল প্রশ্ন
মাদ্রাসা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অসংখ্য ধর্মীয় শিক্ষক আন্তরিকতার সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা দেন। তাই কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে অপরাধের সঙ্গে এক করে দেখা অন্যায়। কিন্তু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর অর্থ সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা থেকে বিরত থাকা নয়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর ১৭ মে ২০২৬-এর এক বিশ্লেষণে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংবাদমাধ্যমভিত্তিক পর্যবেক্ষণের বরাতে জানানো হয়, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষকদের হাতে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন এবং যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের মোট ৯৪৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ৭৩৭টি শারীরিক নির্যাতন এবং ২১১টি যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের ঘটনা। ২০২৪ সালে শিক্ষকদের যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের নথিভুক্ত ঘটনা আগের বছরের ৩০ থেকে বেড়ে ৯০-এ পৌঁছেছিল।
এখানে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য একত্রে বিবেচনা করা হয়েছে। এই সংখ্যাকে শুধু মাদ্রাসার ঘটনা হিসেবে দেখানো যাচ্ছে না। তবে বিশ্লেষণের অনিবন্ধিত ও কম তদারকির আওতায় থাকা কিছু কওমি মাদ্রাসা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠানে নিবন্ধন, নিয়মিত পরিদর্শন, শিক্ষক নিয়োগে যাচাই এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা দুর্বল।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো- প্রতিষ্ঠানটি যে ধারারই হোক, সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিক্ষক নিয়োগের আগে উপযুক্ত যাচাই, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, স্বাধীন অভিযোগ কমিটি, নিয়মিত পরিদর্শন এবং অভিযোগের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশুর সঙ্গে অভিভাবকের নিয়মিত যোগাযোগ, নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং বাইরের স্বাধীন তদারকি থাকতে হবে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধকে সাহসী করে
২০২৬ সালের ২২ মে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, আসকের হিসাবে ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ৪৬ জন। ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার পর অন্তত ১৭ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এগুলো শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। তবে ধর্ষণের অভিযোগ, ধর্ষণচেষ্টা, হত্যার ঘটনা, মামলা ও আদালতে প্রমাণিত অপরাধ- সব কিছুর পরিসংখ্যান এক নয়। সংবাদমাধ্যমে নথিভুক্ত ঘটনাও প্রকৃত ঘটনার পূর্ণ হিসাব নয়। সামাজিক লজ্জা, ভয়, আর্থিক অসামর্থ্য ও প্রভাবশালী অভিযুক্তের কারণে বহু ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না।
বিচারহীনতা অপরাধীর মনে এই ধারণা তৈরি করে যে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। তদন্ত দীর্ঘায়িত হলে, সাক্ষীকে ভয় দেখানো গেলে কিংবা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে পরিবারকে নীরব করা গেলে শিশুর নিরাপত্তা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত বিচার বলতে শুধু দ্রুত রায় ঘোষণা নয়, মানসম্মত তদন্ত, শিশুবান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং আইনসম্মতভাবে রায় কার্যকর করাও বোঝায়।
চড় দিয়ে শুরু, তারপর কী?
শিশু নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ কখনো মারধর, অপমান কিংবা গণপিটুনিতে রূপ নেয়। এই ক্ষোভের পেছনে বিচারহীনতার অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। কিন্তু চড় দিয়ে শুরু হয়ে প্রতিশোধ যদি দিগম্বর করা, মাথা মুড়িয়ে দেওয়া কিংবা অঙ্গচ্ছেদের মতো বর্বরতায় পৌঁছে যায়, তবে সমাজ আরেকটি বিপজ্জনক সংকটে পড়বে।
অপরাধীর বিচার হতে হবে আইনের মাধ্যমে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তে নির্ধারিত হবে, অভিযুক্ত ন্যায়সংগত বিচার পাবেন এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি কার্যকর হবে। জনতার বিচার নিরপরাধ ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে, প্রমাণ নষ্ট করতে পারে এবং প্রকৃত অপরাধীকে আড়াল করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই ক্ষোভকে প্রতিহিংসায় নয়, কার্যকর বিচার ও জবাবদিহির দাবিতে রূপ দিতে হবে।
শিশুর নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের দায়
সরকার যদি সত্যিই শিশুবান্ধব রাষ্ট্র গড়তে চায়, তবে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের তদন্ত ও বিচারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালসহ সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচারাধীন মামলার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। তদন্তে গাফিলতি, প্রভাব বিস্তার, সাক্ষীকে ভয় দেখানো এবং অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইনসম্মত চূড়ান্ত রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে। তবে শাস্তির কঠোরতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধীর বিচার নিশ্চিত হওয়ার বিশ্বাস। মৃত্যুদণ্ডসহ কোনো শাস্তিই যথাযথ বিচার ও আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া প্রয়োগ করা যায় না। কিন্তু চূড়ান্ত রায় কার্যকরে অযৌক্তিক বিলম্বও ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করে।
পরিবারকে শিশুর কথা শুনতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অভিযোগের নিরাপদ পথ তৈরি করতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। আর রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে, কোনো শিশু অভিযোগ জানালে তার পরিবার কিংবা প্রতিষ্ঠানকে ভয় দেখিয়ে তাকে নীরব করা যাবে না।
শিশু যখন কোনো মুরুব্বির কোলে যেতে চায় না, তখন তাকে জোর করবেন না। শিশু যখন কোনো শিক্ষককে এড়িয়ে চলে, তখন তার ভয়কে অবাধ্যতা বলে উড়িয়ে দেবেন না। আগে জানার চেষ্টা করুন, সে কেন অস্বস্তি বোধ করছে। শিশুর কথা শুনুন, তাকে নিরাপদ রাখুন এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নিন।
গাছের প্রথম পেয়ারা, আনার, পেঁপে কিংবা লাউ হুজুরকে দেওয়া হতে পারে শ্রদ্ধার প্রকাশ। কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন কখনো প্রশ্নহীন আনুগত্যে পরিণত না হয়। ধর্মীয় শিক্ষক, আত্মীয়, মুরুব্বি কিংবা সামাজিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি- কেউই শিশুর নিরাপত্তার ঊর্ধ্বে নন।
আমাদের শৈশব ও কৈশোরের অভিজ্ঞতা যদি পরবর্তী প্রজন্মকে নিরাপদ করতে না পারে, তবে সেই ব্যর্থতার দায় আমাদেরই। শিশুর কান্না থামিয়ে দেওয়া নয়, কান্নার কারণ বোঝা জরুরি। প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা নয়, সত্য উদ্ঘাটন জরুরি। আর প্রতিশ্রুতি নয়, চাই কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা ও দৃশ্যমান জবাবদিহি।
শিশুর জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার চেয়ে কোনো মুরুব্বির সম্মান, কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম কিংবা কোনো ধর্মীয় পরিচয় বড় হতে পারে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে শিশুদের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।