কিশোর অপরাধের রাশ টানতে হবে

মতামত

‘কিশোর’ শব্দটি কানে আসলেই একটু আদর, ভালোবাসা, ভালো লাগা, কিছুটা আবেগ কিংবা হৃদ্যতার অনুভূতি মনে ভেসে ওঠে। সন্দেহ নেই, বয়সটাও

2026-10-30T19:26:05+00:00
2026-10-30T19:26:05+00:00
  সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬,
১৮ কার্তিক ১৪৩৩
 
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
মতামত
কিশোর অপরাধের রাশ টানতে হবে
সাজ্জাদ হোসেন খাঁন
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:২৬ পিএম 
কিশোর অপরাধের রাশ টানতে হবে
‘কিশোর’ শব্দটি কানে আসলেই একটু আদর, ভালোবাসা, ভালো লাগা, কিছুটা আবেগ কিংবা হৃদ্যতার অনুভূতি মনে ভেসে ওঠে। সন্দেহ নেই, বয়সটাও আদুরে। কোমলমতি চেহারাটিকে ভালোবাসতে সবারই মন চায়। কঠোর মানসিকতার মানুষও কিশোর-তরুণদের ভালোবাসে। বয়সটাই এমন। কিন্তু এখন? কিছু কিশোরের অসংলগ্ন আচরণের কারণে মানুষের স্মৃতিতে এখন আর সে ধরনের সহানুভূতি তেমন জাগে না। এর সংগত কারণও আছে। সময়, অবস্থা, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি—সামগ্রিক দৃশ্যপট বিবেচনায় কিশোর অপরাধ এখন কঠিন বাস্তবতা। প্রতিনিয়ত এ বাস্তবতা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আগামীতে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে কি না কিংবা আদৌ সম্ভব কি না, তা-ও বলা যাচ্ছে না।

দুই। নিকট অতীতেও সন্ধ্যার পর কিশোর বয়সী কেউ বাসার বাইরে থাকত না। বলা যায়, পরিবার থেকে এমন অনুমতি ছিল না। অনেকটা নিষিদ্ধই ছিল। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকার অনুমতি কোনোভাবেই ছিল না। কেউ কখনো কোনো কারণে সন্ধ্যার পর বাইরে থেকে গেলে তার ওপর অলিখিত ‘১৪৪ ধারা’ জারি হয়ে যেত। বুক ধুকধুক করেই তাকে ঘরে ফিরতে হতো। প্রতিনিয়ত শঙ্কায় থাকতে হতো। মনে মনে ভাবত—‘জানি না, আজ কী হবে। আমার ওপর দিয়ে কোনো ঝড় বয়ে যাবে কি না!’ এমন কঠোর ও কঠিন পরিস্থিতি মাথায় নিয়েই বাসায় ফিরতে হতো। তদুপরি, বাসায় ফিরেই কঠোর জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হতো। রীতিমতো আদালতে জবানবন্দি দেওয়া বা জেরার মতো অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে কখনো বেত্রাঘাত, কখনো হুমকি-ধমকিসহ নানা শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো।

কিন্তু এখন? এখন তো প্রায়ই সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা। আগের এসব দৃশ্য, পরিস্থিতি কিংবা শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার মতো কোনো অবস্থাই এখন আর অবশিষ্ট আছে কি না, সন্দেহ। ফলে পরিবার ও সমাজে যা হওয়ার, তা-ই হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সন্ধ্যার পর একজন কিশোর বা শিক্ষার্থীর কাজ কী? সন্ধ্যার পর তো ক্লাস বা কোচিং থাকার কথা নয়। তাহলে কেন একজন কিশোর বা শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে থাকবে? অভিভাবকেরাই বা কেন তাঁদের সন্তানদের সন্ধ্যার পর বাইরে থাকার অনুমতি দেবেন? এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন ও সতর্ক হওয়া জরুরি।

প্রতিদিন সন্ধ্যার পর চট্টগ্রাম শহরের জামাল খান মোড়, কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়াম এলাকা, চেরাগি পাহাড় মোড়, জিইসি মোড়, বিবিরহাট বশর মার্কেট, গ্রিন ভিউ, সুন্নিয়া মাদ্রাসার মাঠসংলগ্ন রেললাইনের উত্তর ও দক্ষিণ পাশ, এশিয়া ফ্যান ফ্যাক্টরির পূর্ব পাশ, মুরাদপুর, চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সের পূর্ব ও দক্ষিণ পাশের সড়ক, ষোলশহর, দুই নম্বর গেটের বিপ্লব উদ্যান ও আশপাশের এলাকাসহ বিভিন্ন অভিজাত বিপণিবিতানের চত্বরে কিশোর-তরুণদের সরব উপস্থিতি অনেক প্রশ্নেরই উদ্রেক করে। হয়তো কোনো সচেতন অভিভাবক চোখ-কান খোলা রেখে এসব এলাকায় একটু সময় ব্যয় করলে বাস্তব ও কঠিন অবস্থা অবলোকন করার সুযোগ পাবেন। তবে এমনটি মোটেও নয় যে এসব স্থানে উপস্থিত সব কিশোর-তরুণ অপরাধের সঙ্গে জড়িত। অতএব, এখনো সময় আছে সতর্ক, সচেতন, কঠোর ও সাবধান হওয়ার।

তিন। কিশোর-তরুণরা অপরাধে জড়াচ্ছে কেন? বিষয়টি আসলেই গবেষণার দাবি রাখে। এর অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কারণ বলা যায়। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের ঘাটতি, সমকালীন প্রেক্ষাপটে পারিবারিক অনুশাসন কমে যাওয়া, বন্ধু নির্বাচনে অপরিণামদর্শিতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ কমে যাওয়া, উন্নত প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া ও তা অনুকরণ, সুষ্ঠু ও সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার অভাব, ক্রমাগত খেলার মাঠ কমে যাওয়া, সামাজিকভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন না থাকা, প্রতিনিয়ত সাইবার জগতে ডুবে থাকা এবং সেখান থেকে যা শিখছে, তা প্রয়োগ করতে গিয়ে বিপথগামী হওয়া।

তাছাড়া ভিন্ন একটি চিত্রও আছে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, বাবা-মা দুজনই চাকরিজীবী। ফলে সন্তানের প্রতি তাঁদের সচেতন থাকার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা হচ্ছে না। এতে করে সন্তানরা সহজেই বিপথগামী হয়ে উঠছে।

তবে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো, পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার কারণে অনেকে প্রচুর টাকার মালিক হচ্ছেন। ফলে এসব পরিবারের সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই অর্থের প্রতি প্রলুব্ধ হচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই সহজে তাদের হাতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ চলে আসছে। সেই অর্থ কেউ কেউ নানা অপকর্মে ব্যয় করছে। জড়িয়ে পড়ছে অপরাধচক্রের সঙ্গে।

চার। কিশোর অপরাধপ্রবণতার নতুন সংস্করণ হলো ‘কিশোর গ্যাং’। সাধারণত কিশোর গ্যাং বলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা কয়েকজনের একটি দল কিংবা অভিন্ন কোনো স্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গোষ্ঠীকে বোঝায়। মূলত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়েই গড়ে উঠছে এ ধরনের গ্যাং বা গ্রুপ। স্কুল-কলেজের কিছু শিক্ষার্থী আড্ডা দিতে দিতে ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করে। একসঙ্গে ঘোরাঘুরি, চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া ও খেলাধুলার মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পরে ক্ষমতা, সিনিয়র-জুনিয়র, আধিপত্য ও নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বন্ধুত্বের সম্পর্ক রূপ নেয় হিংস্রতা ও সহিংসতায়। তারা ঘটায় ছোটখাটো সন্ত্রাস ও ছিনতাইয়ের ঘটনা। এসব কিশোর মাদক, খুন, ইভ টিজিং, ছিনতাই, মাদক সেবন, চুরি, এমনকি ধর্ষণের মতো ভয়ংকর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে।

বলা যায়, আমাদের দেশে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর উত্তরায় কিশোর আদনান হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপর থেকে শুরু হয় কিশোর গ্যাংয়ের নানা অপকর্ম।

পাঁচ। কিশোর অপরাধের কারণে পরিবার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। মা-বাবা প্রতিনিয়তই সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত থাকেন। কখন কোন দুঃসংবাদ কানে আসে, সেই শঙ্কায় থাকেন তাঁরা। একজন বিপথগামী কিশোরের জন্য একটি পরিবার যারপরনাই উদ্বিগ্ন থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি একটি পরিবারের জন্য চরম অভিশাপ হয়ে ওঠে। কিন্তু এমন আতঙ্কের সময় আর কত দিন পার করতে হবে?

ঘটনা তো ঘটছে, কিংবা একদিন ঘটবেই। এমন একটি ঘটনাই অনেক কিছু এলোমেলো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রশ্ন উঠতে পারে, আজকের সময়ে কাটানোর উপায় না থাকলে কিশোর-তরুণদের সময় কাটানোর দোষ কী? এমন প্রশ্নও আসতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা সময় কাটানোর নয়; গুরুত্বপূর্ণ ও মুখ্য বিষয় হলো, সময়টা কখন, কোথায়, কার সঙ্গে এবং কীভাবে কাটানো হচ্ছে, সেটাই বিবেচ্য। আজকের সময় কাটানোর বিষয়টিও একজন কিশোরের আগামী জীবনের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। অতএব, এখনো সময় আছে সতর্ক, সচেতন, কঠোর ও সাবধান হওয়ার।

এ জন্য প্রয়োজন পরিবারের কর্তব্যবোধ, অভিভাবক, সমাজ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সতর্কতা ও সচেতনতা। কিশোরদের সামাজিক ও পারিবারিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। সুস্থ-সুন্দর সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ দিতে হবে। খেলাধুলা, মননশীল ও শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী করে তুলতে হবে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বাহ্যিক জ্ঞান আহরণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। নৈতিকতা ও মানবিক জ্ঞান অর্জনে তৎপর হতে হবে। তবেই কিশোর-তরুণরা বিপদমুক্ত হবে। সমাজ হবে জ্ঞাননির্ভর। দেশ পাবে মেধাবী সন্তান।

লেখক: সহ-প্রচার সম্পাদক, জিয়া স্মৃতি পাঠাগার, চট্টগ্রাম।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: