সঠিক ব্যক্তি, স্থান ও সময়ের বাইরে: প্রশাসনিক কার্যকারিতার নতুন তত্ত্ব

মতামত

প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বহুল পরিচিত একটি নীতি হলো ‘যথাযথ ব্যক্তি, যথাযথ স্থান, যথাযথ সময়’। ইংরেজিতে যা ‘Right Person, Right

2026-11-01T16:38:14+00:00
2026-11-01T16:40:15+00:00
  সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬,
১৮ কার্তিক ১৪৩৩
 
সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
মতামত
সঠিক ব্যক্তি, স্থান ও সময়ের বাইরে: প্রশাসনিক কার্যকারিতার নতুন তত্ত্ব
মো. আবদুর রহমান মিঞা
রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ৪:৩৮ পিএম  আপডেট: ০১.১১.২০২৬ ৪:৪০ পিএম
মো. আবদুর রহমান মিঞা
প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বহুল পরিচিত একটি নীতি হলো ‘যথাযথ ব্যক্তি, যথাযথ স্থান, যথাযথ সময়’। ইংরেজিতে যা ‘Right Person, Right Place, Right Time’ নামে পরিচিত। নীতিটির মূল কথা হলো, উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত সময়ে নিয়োজিত করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। সরকারি প্রশাসন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক সংগঠন এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সঠিক ব্যক্তি, সঠিক স্থান ও সঠিক সময় নিশ্চিত করলেই কি প্রশাসনিক সাফল্য নিশ্চিত হয়?

বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, সব সময় তা হয় না। কোনো প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত যোগ্য কর্মকর্তা নিয়োগ করা হতে পারে, তাঁদের উপযুক্ত পদে পদায়ন করা হতে পারে এবং নির্ধারিত সময়েই শূন্য পদ পূরণ করা হতে পারে। তারপরও প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে। কোনো সরকারি দপ্তরে দক্ষ কর্মকর্তার সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হলে দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। কোনো হাসপাতালে দক্ষ চিকিৎসক থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, সহায়ক জনবল ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশের অভাবে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। আবার কোনো উন্নয়ন প্রকল্প দক্ষ জনবল দিয়ে নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হলেও সেটি যদি জনগণের প্রকৃত চাহিদা পূরণ করতে না পারে, তবে সেই সাফল্যের অর্থবহতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রচলিত তিনটি শর্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এই সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসনিক কার্যকারিতা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে আরও সমন্বিতভাবে ব্যাখ্যা করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত হয়েছে ‘ছয়-যথার্থতা তত্ত্ব’ বা ‘Six-Right Theory’। তত্ত্বটির প্রণেতা মো. আবদুর রহমান মিঞা। এর মূল বক্তব্য হলো, প্রচলিত তিনটি যথার্থতার সঙ্গে আরও তিনটি অপরিহার্য মাত্রা যুক্ত করা প্রয়োজন। সেগুলো হলো যথাযথ সংখ্যা, যথাযথ পরিবেশ এবং যথাযথ উদ্দেশ্য। এভাবে তত্ত্বটি ছয়টি আন্তঃসম্পর্কযুক্ত মাত্রার সমন্বয়ে প্রশাসনিক কার্যকারিতা বোঝার একটি ধারণাগত কাঠামো উপস্থাপন করে।

প্রথম মাত্রা হলো যথাযথ সময়। প্রশাসনে শুধু দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং কখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কখন জনবল নিয়োগ করতে হবে এবং কখন কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে, তা নির্ধারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকলে কাজের চাপ বাড়ে, সেবা ব্যাহত হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটে। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, অবকাঠামো কিংবা প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার আগেই কোনো কার্যক্রম শুরু করলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অতএব, যথাযথ সময় বলতে শুধু বিলম্ব পরিহার বোঝায় না; বরং কোনো কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময় নির্বাচনকেও বোঝায়।

দ্বিতীয় মাত্রা হলো যথাযথ স্থান। একজন ব্যক্তিকে কোথায় পদায়ন করা হচ্ছে, তিনি কোন দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রতিষ্ঠানের কোন স্তরে তাঁর দক্ষতা কাজে লাগানো হচ্ছে, তার ওপর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে। একজন প্রকৌশলীকে তাঁর কারিগরি দক্ষতার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করলে তাঁর সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার নাও হতে পারে। একইভাবে, সব দক্ষ জনবল রাজধানী বা বড় শহরে কেন্দ্রীভূত রেখে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত না করলে সামগ্রিক প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। যথাযথ স্থান তাই শুধু ভৌগোলিক অবস্থান নয়; এর সঙ্গে দায়িত্ব, কার্যক্ষেত্র এবং সাংগঠনিক অবস্থানের সামঞ্জস্যও জড়িত।

তৃতীয় মাত্রা হলো যথাযথ সংখ্যা। প্রচলিত তিন-যথার্থতা নীতিতে জনবলের সংখ্যাগত প্রয়োজন স্বতন্ত্রভাবে বিবেচিত হয় না। অথচ বাস্তবে একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে তার কাজের পরিমাণের সঙ্গে জনবল ও সম্পদের সামঞ্জস্যের ওপর। প্রয়োজনের তুলনায় কম জনবল থাকলে কাজের জট, অতিরিক্ত কর্মচাপ, ক্লান্তি এবং সেবার মান হ্রাস পেতে পারে। বিপরীতে, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল থাকলে দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি, সমন্বয়হীনতা, জবাবদিহির অস্পষ্টতা এবং সম্পদের অপচয় ঘটতে পারে। সুতরাং, যথাযথ সংখ্যা বলতে সর্বাধিক বা সর্বনিম্ন জনবল বোঝায় না; বরং কাজের পরিমাণ, দায়িত্ব, অগ্রাধিকার ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জনবল ও সম্পদের পরিমাণকে বোঝায়। প্রযুক্তির পরিবর্তন, কাজের ধরন এবং সেবার চাহিদা বিবেচনায় এই সংখ্যার নিয়মিত পর্যালোচনাও জরুরি।

চতুর্থ মাত্রা হলো যথাযথ ব্যক্তি। কোনো পদে উপযুক্ত ব্যক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলোই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। দক্ষতা, সততা, অভিজ্ঞতা, বিচারবোধ এবং দায়িত্ব পালনের মানসিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যক্তি প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত দক্ষ হতে পারেন, কিন্তু সংবেদনশীল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় বিবেচনাবোধ বা নৈতিক দৃঢ়তা তাঁর মধ্যে না-ও থাকতে পারে। আবার অভিজ্ঞ, সৎ ও দায়িত্বশীল কোনো কর্মীকে তাঁর সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হলে তিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য অধিক কার্যকর হতে পারেন। অর্থাৎ, যথাযথ ব্যক্তি বলতে শুধু সর্বোচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে বোঝায় না; বরং নির্দিষ্ট দায়িত্ব, কর্মপরিবেশ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যক্তিকে বোঝায়।

কিন্তু যথাযথ ব্যক্তিকে নিয়োগ ও পদায়ন করলেই তাঁর কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে তত্ত্বটির পঞ্চম মাত্রা হলো যথাযথ পরিবেশ। একজন দক্ষ কর্মীর কার্যকারিতা বজায় রাখতে পর্যাপ্ত উপকরণ, প্রয়োজনীয় সম্পদ, সহযোগিতামূলক নেতৃত্ব, পেশাগত মর্যাদা, প্রশিক্ষণ ও বিকাশের সুযোগ এবং ন্যায্য স্বীকৃতি প্রয়োজন। কর্মপরিবেশ দীর্ঘদিন প্রতিকূল থাকলে কর্মীদের আগ্রহ, মনোবল ও দায়বদ্ধতা ক্রমশ কমে যেতে পারে। কেউ অতিরিক্ত কর্মচাপে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন, কেউ বদলি চাইতে পারেন, আবার কেউ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যেতে পারেন। ফলে প্রতিষ্ঠান শুধু অভিজ্ঞ জনবলই হারায় না, তার অবশিষ্ট কর্মীদের ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। কোনো কর্মীর প্রত্যাশিত কর্মদক্ষতা না থাকলেই তাঁকে অযোগ্য বলে বিবেচনা করা সঠিক নয়। তাঁর কাজের চাপ, প্রয়োজনীয় উপকরণের প্রাপ্যতা, নেতৃত্বের আচরণ, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং দায়িত্বের স্পষ্টতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অনেক সময় ব্যক্তির দুর্বলতা বলে যে সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়, তার প্রকৃত কারণ নিহিত থাকে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে। যথাযথ পরিবেশ তাই কর্মীদের আরাম-আয়েশের বিষয়মাত্র নয়; এটি দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা ধরে রাখার অন্যতম শর্ত।

ছয়-যথার্থতা তত্ত্বের ষষ্ঠ এবং বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রা হলো যথাযথ উদ্দেশ্য। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি নির্দিষ্ট আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক দায়িত্ব থাকে। সেই দায়িত্ব পালনের জন্যই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, সম্পদ বরাদ্দ করা হয় এবং জনবল নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান যথাযথ সময়ে কাজ করল, সঠিক স্থানে দক্ষ জনবল নিয়োজিত করল, পর্যাপ্ত কর্মী ও সম্পদ নিশ্চিত করল এবং ভালো কর্মপরিবেশ গড়ে তুলল, তবুও যদি তার কার্যক্রম বৈধ ও ন্যায্য উদ্দেশ্য পূরণে ভূমিকা না রাখে, তবে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা দিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বিচার করা যায় না।

ধরা যাক, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান দ্রুত ফাইল নিষ্পত্তি করছে, নির্ধারিত বাজেট দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করছে এবং বিভিন্ন কর্মসম্পাদন সূচকে ভালো ফল দেখাচ্ছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি যদি তার মূল দায়িত্ব অনুযায়ী জনগণের প্রয়োজন পূরণ করতে না পারে, তবে এসব সাফল্যের তাৎপর্য সীমিত থেকে যায়। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠান তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে পারে। অভ্যন্তরীণ স্বার্থ, স্বল্পমেয়াদি চাপ কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাহিদা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে যে প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত উদ্দেশ্য ও বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।

যথাযথ উদ্দেশ্য তাই প্রশাসককে শুধু এই প্রশ্ন করতে বলে না যে কোনো কাজ দক্ষতার সঙ্গে করা সম্ভব কি না; বরং কাজটি কেন করা হচ্ছে, এটি প্রতিষ্ঠানের বৈধ দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না এবং এর মাধ্যমে যাঁদের সেবা দেওয়ার কথা, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে উপকৃত হচ্ছেন কি না, সেটিও যাচাই করতে বলে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, স্বাধীন পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও মতামত বিবেচনায় নেওয়ার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্যের যথার্থতা যাচাই করা যেতে পারে।

ছয়-যথার্থতা তত্ত্বের বিশেষত্ব শুধু ছয়টি উপাদান চিহ্নিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল বক্তব্য হলো, এই ছয়টি মাত্রা পরস্পরনির্ভরশীল। একটির দুর্বলতা অন্যগুলোর কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জনবলস্বল্পতার কারণে কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কর্মচাপ কর্মপরিবেশকে প্রতিকূল করে তুলতে পারে এবং কর্মীদের বদলি বা চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়াতে পারে। ফলে নতুন পদ শূন্য হয়, নিয়োগে বিলম্ব ঘটে এবং অবশিষ্ট কর্মীদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হয়। এভাবে একটি সমস্যা ধীরে ধীরে একাধিক প্রশাসনিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

একইভাবে, প্রতিকূল কর্মপরিবেশ দক্ষ কর্মীদের নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে, আবার প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি দক্ষ জনবল ও পর্যাপ্ত সম্পদকেও ভুল কাজে ব্যবহার করতে পারে। তাই প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। শুধু কর্মী পরিবর্তন করে এমন সমস্যার সমাধান হবে না, যার প্রকৃত কারণ সম্পদের অভাব বা দায়িত্বের অস্পষ্টতা। আবার শুধু জনবল বাড়ালেই কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে না, যদি কাজের বণ্টন ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য যথাযথ না হয়।

এই তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দক্ষতা, কার্যকারিতা ও মানবকল্যাণের সম্পর্ক। দক্ষতা বলতে সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার বোঝায়, আর কার্যকারিতা বলতে নির্ধারিত ফল অর্জন বোঝায়। কিন্তু এই দুই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠানের বৈধ উদ্দেশ্য ও জনকল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান ভুল লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত দক্ষ হতে পারে। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সংখ্যাগত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেও জনগণের প্রকৃত প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থ হতে পারে। যথাযথ উদ্দেশ্য তাই প্রশাসনিক সাফল্যকে শুধু কার্যক্রমের পরিমাণ বা প্রক্রিয়াগত দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে।

সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি সংস্থায় এই কাঠামোর ব্যবহারিক প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। সরকারি প্রশাসনে এটি জনবল নিয়োগ, পদায়ন, কর্মপরিকল্পনা, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস ও কর্মসম্পাদন মূল্যায়নে সহায়ক হতে পারে। শিক্ষা খাতে শুধু যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, শিক্ষার পরিবেশ, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং শিক্ষার প্রকৃত ফলাফল বিবেচনার গুরুত্ব তুলে ধরে। স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা, তাঁদের কর্মস্থল, রোগীর চাহিদা, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সেবার উদ্দেশ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে এটি জনবল বণ্টন, উৎপাদনশীলতা, কর্মপরিবেশ এবং সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে।

কোনো নতুন প্রকল্প অনুমোদন, কর্মসূচি গ্রহণ কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের আগে ছয়টি প্রশ্ন বিবেচনা করা যেতে পারে: কাজটি কি যথাযথ সময়ে করা হচ্ছে? এটি কি যথাযথ স্থানে বাস্তবায়িত হচ্ছে? জনবল ও সম্পদের সংখ্যা কি প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কি যথাযথ? তাঁদের কাজের পরিবেশ কি কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের উপযোগী? সর্বোপরি, উদ্যোগটি কি বৈধ, স্পষ্ট ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণ করছে?

প্রশ্নগুলো সহজ হলেও সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিকতর পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে পারে। এর মাধ্যমে দৃশ্যমান প্রশাসনিক তৎপরতা ও প্রকৃত উন্নতির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করাও সহজ হয়। নতুন সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি, জনবল বৃদ্ধি কিংবা ফাইল নিষ্পত্তির গতি বাড়ানোকে অগ্রগতি হিসেবে দেখানো সম্ভব। কিন্তু এসব পরিবর্তন সব সময় উন্নত ফলাফল নিশ্চিত করে না। ছয়-যথার্থতা তত্ত্ব প্রশাসকদের এমন পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক কার্যকারিতা ও জনকল্যাণের বাস্তব ফলাফল পর্যালোচনা করতে উৎসাহিত করে।

প্রশাসনিক চিন্তাধারার প্রচলিত তত্ত্বগুলোর সঙ্গেও ছয়-যথার্থতা তত্ত্বের সম্পর্ক রয়েছে। ম্যাক্স ওয়েবারের আমলাতন্ত্রবিষয়ক ধারণায় আনুষ্ঠানিক কাঠামো, নির্ধারিত দায়িত্ব ও নিয়মভিত্তিক প্রশাসনের গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে। এলটন মেয়োর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবসম্পর্কভিত্তিক চিন্তাধারা কর্মীদের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরে। হার্বার্ট সাইমনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সীমাবদ্ধ যৌক্তিকতার ধারণা বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমাবদ্ধতা বুঝতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, ব্যবস্থাভিত্তিক চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর গুরুত্ব দেয়। ছয়-যথার্থতা তত্ত্ব এসব চিন্তাধারায় প্রতিফলিত বিভিন্ন উদ্বেগকে একটি স্মরণযোগ্য কাঠামোর মধ্যে সমন্বিত করার চেষ্টা করে। এর সম্ভাব্য অবদান হলো, বহুল পরিচিত প্রশাসনিক নীতির ভিত্তিতে ছয়টি মাত্রাকে একটি আন্তঃসম্পর্কযুক্ত ব্যবস্থায় উপস্থাপন করা এবং প্রতিটি মাত্রাকে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করা।

তবে তত্ত্বটিকে এখনই সব ধরনের প্রশাসনিক সমস্যার সর্বজনীন ও চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এর ধারণাগত বক্তব্যগুলোর যথার্থতা নিরূপণে আরও গবেষণা প্রয়োজন। প্রতিটি মাত্রাকে পরিমাপযোগ্য সূচকে রূপান্তর করতে হবে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক পরীক্ষা করতে হবে। নিয়োগে বিলম্বের সময়কাল, কাজের পরিমাণের সঙ্গে জনবলের অনুপাত, দক্ষতা ও দায়িত্বের সামঞ্জস্য, কর্মীদের কর্মপরিবেশ সম্পর্কে মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য অর্জনের মাত্রা এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার মাধ্যমে একটি মাত্রার দুর্বলতা পরবর্তী সময়ে অন্য মাত্রাগুলোর কার্যকারিতাকে কীভাবে প্রভাবিত করে, তা পরীক্ষা করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে ছয়টি মাত্রা কতটা স্বতন্ত্র, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের গুরুত্বের তারতম্য কতখানি এবং ভবিষ্যতে আরও কোনো স্বতন্ত্র মাত্রা চিহ্নিত করার প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেসব প্রশ্নও গবেষণার মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে। একটি তত্ত্বের গ্রহণযোগ্যতা শুধু তার সরলতা বা স্মরণযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে না; বরং বাস্তব সমস্যা ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা, প্রমাণের মাধ্যমে যাচাইযোগ্যতা এবং ব্যবহারিক উপযোগিতার ওপরও নির্ভর করে।

ছয়-যথার্থতা তত্ত্বের মূল বক্তব্য হলো, প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ ব্যক্তিকে নিয়োগ করাই শেষ কথা নয়; বরং তাঁকে উপযুক্ত স্থানে নিয়োজিত করতে হবে, প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল ও সম্পদ নিশ্চিত করতে হবে, সহায়ক কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে এবং বৈধ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যথাযথ সময়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এই শর্তগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

প্রচলিত ‘যথাযথ ব্যক্তি, যথাযথ স্থান, যথাযথ সময়’ নীতিটি মূল্যবান এবং প্রাসঙ্গিক। ছয়-যথার্থতা তত্ত্ব সেটিকে বাতিল করতে চায় না; বরং এর পরিসর আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব দেয়। এর ছয়টি মাত্রা প্রশাসক, নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের জন্য এমন একটি সাধারণ কাঠামো তৈরি করতে পারে, যার সাহায্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নির্ণয় এবং উন্নত ফলাফল অর্জনের পথ অনুসন্ধান করা সম্ভব।

পরিশেষে, প্রশাসনের মান শুধু কতটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, কত দ্রুত ফাইল নিষ্পত্তি হলো কিংবা কতগুলো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা গেল, তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। প্রশাসনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান তার বৈধ দায়িত্ব কতটা যথাযথভাবে পালন করছে, সম্পদ কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করছে, কর্মীদের সক্ষমতা কতটা ধরে রাখতে পারছে এবং জনগণের জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে, তার ওপর।

প্রচলিত নীতি প্রশাসককে তিনটি প্রশ্নের মুখোমুখি করে: কে কাজ করবেন, কোথায় করবেন এবং কখন করবেন। ছয়-যথার্থতা তত্ত্ব এর সঙ্গে আরও তিনটি প্রশ্ন যুক্ত করে: কতজন বা কতটুকু সম্পদ প্রয়োজন, কোন পরিবেশে কাজটি সফল হতে পারে এবং সর্বোপরি, কাজটি কেন করা হচ্ছে?

এই ছয়টি প্রশ্নের সমন্বিত বিবেচনা প্রশাসনিক কার্যকারিতাকে নতুনভাবে বোঝার একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, জবাবদিহি ও মানবকল্যাণ পরস্পরের পরিপূরক।

মো. আবদুর রহমান মিঞা প্রণীত ‘ছয়-যথার্থতা তত্ত্ব’ জনপ্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক কার্যকারিতা বিশ্লেষণের একটি ধারণাগত কাঠামো।

অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন), বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), ঢাকা, বাংলাদেশ


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: