কোনো এক পরীক্ষার রেজাল্ট পরীক্ষার্থী, পরিবার বা সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, আবার নাও পারে। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায় কেউ জিপিএ-৫ পেয়েছে, কেউ প্রত্যাশার চেয়ে কম গ্রেড পেয়েছে, কেউ এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হতে পারে। শিক্ষাজীবনে এমন পরিস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রেজাল্টকে ঘিরে পারিবারিক প্রত্যাশা, সামাজিক তুলনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ যখন একজন শিক্ষার্থীর ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করে, তখন বিষয়টি আর শুধু পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরীক্ষার রেজাল্টের পর সন্তানের সঙ্গে পরিবারের আচরণ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ আশানুরূপ ফল করতে না পারলে তাকে কোনোভাবেই দোষারোপ করা যাবে না। তার কথা শুনতে হবে। সমস্যার কারণ বুঝতে হবে। এই সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে দেওয়াই হবে অভিভাবকের অন্যতম দায়িত্ব।
এই জায়গাতেই পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করতে না পারা অথবা এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করার পর সন্তানকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দেওয়া যায় আবার অসতর্ক কথায় তার হতাশা আরও বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। রেজাল্টের পর বাবা-মায়ের প্রথম প্রতিক্রিয়া তাই খুব বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। সন্তানের কোথায় ভুল হয়েছে, কীভাবে সেই ভুল কাটিয়ে ওঠা যায়, তা নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হবে। কিন্তু সেই আলোচনায় অপমান, হুমকি কিংবা অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা যেন জায়গা না পায়। পরীক্ষায় ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলা আর সন্তানকে ব্যর্থ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা এক বিষয় নয়। আমরা মনে রাখব, আর কিছুক্ষণ পরই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে না।
পাসের হার কমলে উদ্বেগ বাড়ে
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের বিষয়টি ভাবাচ্ছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে সম্মিলিত পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬.৭১ শতাংশ পয়েন্ট। গত ২২ বছরে এবার পরীক্ষার পাশের হার সবচেয়ে কম। তাছাড়া এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন, আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। অর্থাৎ সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
এবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। সে হিসাবে প্রায় ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন পাস করতে পারেনি। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪৮ শতাংশই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এই বিপুলসংখ্যক ছেলেমেয়ের সামনে এখন নতুন করে পড়াশোনার প্রস্তুতি, পরবর্তী পরীক্ষার পরিকল্পনা এবং শিক্ষাজীবনের পথ নির্ধারণের দরকার আছে।
পরীক্ষার পাশের হার, গ্রেড ইত্যাদি জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষার চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী কেন পাস করতে পারেনি, তার ব্যাখ্যা এই পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় না। কারও প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকতে পারে, কারও কোনো বিষয়ে ভিত্তি দুর্বল হতে পারে। অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পরীক্ষাভীতি কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপও পরীক্ষার পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলতে পারে। একই রেজাল্টের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা থাকে। সুতরাং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানো সমস্যার সমাধান নয়।
রেজাল্টের পর আত্মহত্যা ঠেকাতে পরিবারই প্রথম ভরসা
অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, বাংলাদেশে পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর আসতে থাকে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের রেজাল্ট প্রকাশের পরও বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া অথবা প্রত্যাশিত রেজাল্ট না পাওয়ার পর তৈরি হওয়া মানসিক সংকটের কথা উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল প্রকাশিত MultiPsych সাময়িকীর এক গবেষণায় পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত ১৪২টি সংবাদে প্রকাশিত আত্মহত্যার ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং এবং অভিভাবকদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। সংবাদে প্রকাশিত ঘটনা বিশ্লেষণ করে সব আত্মহত্যার কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে পরীক্ষার রেজাল্টকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া চাপ যে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
আত্মহত্যার পেছনে সাধারণত একাধিক জটিল কারণ কাজ করতে পারে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দীর্ঘদিনের মানসিক সংকট, সামাজিক অপমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় এবং সহায়তার অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। পরীক্ষার রেজাল্টের পর সন্তানের আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা করাও বিপজ্জনক।
হতে পারে সন্তান নিজ রেজাল্ট নিয়ে এমনিতেই ভেঙে পড়েছে। তার ওপর বাবা-মা যদি বলেন, এত টাকা খরচ করেও এই রেজাল্ট, আত্মীয়স্বজনকে মুখ দেখাব কীভাবে, কিংবা অন্যের সন্তান পারলে তুমি পারলে না কেন, তাহলে সে নিজেকে পরিবারের বোঝা ভাবতে শুরু করবে। কথাগুলো অভিভাবক হয়তো রাগের মাথায় বলেন, কিন্তু সন্তানের মনে তার প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তা সব সময় আমরা বুঝতে পারি না।
সন্তানকে জেরা নয়, কথা বলার সুযোগ দিন
পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলে সন্তানকে নিয়ে বসুন, কিন্তু সেই আলোচনাকে জেরার আসরে পরিণত করবেন না। কোন বিষয়ে সমস্যা হয়েছে, প্রস্তুতির সময় কোথায় ঘাটতি ছিল, পরীক্ষার সময় কোনো অসুবিধা হয়েছিল কি না, পরেরবার ভালো করার জন্য কী সহায়তা প্রয়োজন, এসব নিয়ে শান্তভাবে কথা বলুন। সন্তানের কথা শেষ হওয়ার আগেই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া কিংবা তার ব্যাখ্যাকে অজুহাত বলে উড়িয়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান করে না।
এক বা একাধিক বিষয়ে ফেল করলে সেই বিষয়গুলো আবার পড়ার সুযোগ আছে। রেজাল্টে ভুল আছে বলে মনে হলে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা যায়। ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার রেজাল্টের জন্য ১ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। যারা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদেরও পরবর্তী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া, পড়াশোনার পদ্ধতি বদলানো এবং প্রয়োজনে শিক্ষক বা টিউটরের সহায়তা নেওয়ার সুযোগ আছে।
এসব পথ নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে। সবার সামনে ঘোষণা দিয়ে দেওয়া যে সন্তানকে এবার যেভাবেই হোক জিপিএ-৫ পেতে হবে, তাতে চাপ আরও বাড়তে পারে। তার সামর্থ্য, দুর্বলতা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে লক্ষ্য নির্ধারণ করা দরকার। কোনো শিক্ষার্থীকে নতুন করে প্রস্তুতি নিতে কয়েক মাস সময় দিতে হবে, কাউকে পড়াশোনার পদ্ধতি বদলাতে হবে, কাউকে হয়তো মানসিক চাপ সামলানোর জন্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে।
অভিভাবকদের এটাও বুঝতে হবে, সন্তানের শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করা, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ না হলে সন্তানকে ভালোবাসা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা যায় না।
ভালো রেজাল্টের আনন্দ হোক, অন্যের ব্যর্থতা নিয়ে উপহাস নয়
পরীক্ষার রেজাল্ট ঘিরেআমাদের সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন আনা দরকার। আত্মীয়দের মধ্যে কে জিপিএ-৫ পেল, কার সন্তান কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো, কার সন্তান কত ভালো চাকরি পেল, এসব নিয়ে তুলনা করার প্রবণতা আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভালো রেজাল্টের খবর কখনো কখনো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন সর্বোচ্চ গ্রেড না পাওয়া শিক্ষার্থীরা জীবনের প্রতিযোগিতায় অযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে।
ভালো রেজাল্ট অবশ্যই আনন্দের। সন্তান ভালো করলে তাকে অভিনন্দন জানাতে হবে। কিন্তু সেই আনন্দ যেন অন্য কোনো শিক্ষার্থীর অপমানের কারণ না হয়। প্রতিবেশীর সন্তান ফেল করেছে বলে তাকে নিয়ে হাসাহাসি, আত্মীয়দের সামনে তিরস্কার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ব্যর্থতা ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন শিশু বা কিশোর-কিশোরীর আত্মমর্যাদা রক্ষা করা শুধু তার পরিবারের দায়িত্ব নয়, সমাজেরও দায়িত্ব।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও রেজাল্ট প্রকাশের পর দায়িত্ব আছে। যারা অকৃতকার্য হয়েছে বা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম নম্বর পেয়েছে, তাদের সঙ্গে শিক্ষকরা যোগাযোগ করতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা, পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। সব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর না থাকলে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
আমরা চাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রেজাল্ট প্রকাশের সময় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য সহজ ভাষায় নির্দেশনা দেবে। মানসিক সংকটে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে, জরুরি সহায়তা কীভাবে পাওয়া যাবে, এসব তথ্যও প্রকাশ করা দরকার। সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
জীবনের দরজা একটি পরীক্ষায় বন্ধ হয় না
সন্তান নিজের জীবন নিয়ে হতাশার কথা বললে, আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিলে অথবা তার আচরণে গুরুতর পরিবর্তন দেখা গেলে তাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। সন্তানকে দোষারোপ না করে তার কথা শুনতে হবে। সন্তানকে একা ফেলে রাখা যাবে না এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সহায়তা নিতে হবে।
পরিবারের পক্ষ থেকে সবচেয়ে জরুরি বার্তাটি হতে পারে খুব সাধারণ, কিন্তু তার গুরুত্ব অসাধারণ। রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, আমরা একসঙ্গে বসে পরবর্তী পথ নির্ধারণ করব। কোথায় সমস্যা হয়েছে, তা বুঝব। আবার চেষ্টা করব। তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন, কিন্তু তোমাকে হারানোর চেয়ে বড় কোনো উদ্বেগ আমাদের নেই।
কোনো সন্তানের যেন পরীক্ষার নম্বরের কারণে পরিবারের ভালোবাসা হারানোর ভয় তৈরি না হয়। রেজাল্ট নিয়ে আলোচনা হবে, ভুল সংশোধনের চেষ্টা হবে, নতুন পরিকল্পনাও হবে। কিন্তু সবকিছুর আগে থাকবে সন্তানের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবন। একটি পরীক্ষার রেজাল্ট গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই রেজাল্টের চেয়ে সন্তানের জীবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী