ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ কয়েকটি দাবিতে শ্রমিক বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুই শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুর। রোববার দিনভর কর্মবিরতি, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনার পর দুই এলাকায় মোট ২৭৭টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাভার-আশুলিয়ায় ১৭৭টি এবং গাজীপুরে ১০০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
রোববার (১ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি জানান, সকাল থেকেই বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৭৭টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে জেলার ১০০টি কারখানা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে সোমবার থেকে কারখানাগুলো পুনরায় চালুর কথা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, কোনাবাড়ী থেকে কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ এলাকা পর্যন্ত সড়কের পাশের কয়েকটি কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছেন আন্দোলনকারীরা। এতে কারখানা কর্তৃপক্ষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
আশুলিয়ায় কর্মবিরতি থেকে সড়ক অবরোধ
সকালে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম, টাউজার লাইন ও নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়ে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে তারা কারখানা থেকে বেরিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে আশপাশের অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরাও তাদের আন্দোলনে যোগ দেন।
দুপুর ১২টার দিকে নরসিংহপুর এলাকায় অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেন। তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ ও অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকরা। পরে বিকেল ৫টার দিকে পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।
গাজীপুরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষ
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি, মৌচাক ও কোনাবাড়ীসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে সকাল থেকেই বিক্ষোভ শুরু হয়।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কয়েকটি স্থানে সড়কে কাঠ ও বাঁশ ফেলে আগুন দেন বিক্ষোভকারীরা। যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরের পাশাপাশি পুলিশ বক্স ও একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এগিয়ে গেলে শ্রমিকদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে একে একে ১০০টি কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
শ্রমিকদের তিন প্রধান দাবি
আন্দোলনরত শ্রমিকদের ভাষ্য, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার প্রথা বন্ধ এবং অন্যায্যভাবে চাকরিচ্যুতি বন্ধের দাবিতে তারা রাজপথে নেমেছেন।
সাভার-আশুলিয়ার কমফোর্ট কালেকশন পোশাক কারখানার অপারেটর রাজু আহমেদ বলেন, তাদের কারখানায় হেলপারদের মাসিক বেতন মাত্র ৮ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা। অথচ অন্য অনেক কারখানায় একই পদের শ্রমিকরা তুলনামূলক বেশি বেতন পান। অন্য প্রতিষ্ঠানে হাজিরা বোনাস ১ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হলেও তাদের কারখানায় দেওয়া হয় মাত্র ৫০০ টাকা। ন্যায্য মজুরি ও ভাতার দাবিতেই তারা আন্দোলনে নেমেছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, শ্রমিকদের তিনটি প্রধান দাবির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা। এ বিষয়ে রোববার মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। তবে দাবি আদায়ে আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা সড়কে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন।